দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক, কবি ও গবেষক আবদুল হাই শিকদার বলেছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি নন; তিনি ছিলেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর, বিদ্রোহের প্রতীক এবং উপমহাদেশের গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। শনিবার (২৩ মে) বিকালে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে 'কবি নজরুলের সাংবাদিকতা' বিষয়ক সেমিনার, নজরুল পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আলোচকের বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।
নজরুলের সৃষ্টি স্বাধীনতা ও মানবতার সংগ্রাম
বাংলা একাডেমি আয়োজিত অনুষ্ঠানে আবদুল হাই শিকদার আরও বলেন, নজরুলের প্রতিটি সৃষ্টি ছিল স্বাধীনতা, মানবতা ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অংশ। বাংলা ভাষার ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিদ্রোহী শক্তিকে তিনি সাহিত্যের মাধ্যমে বিস্ফোরিত করেছিলেন। তার মতে, নজরুলের জন্ম না হলে বাংলা ভাষার ভেতরে যে ডিনামাইটের মতো শক্তি লুকিয়ে আছে তা আমরা জানতে পারতাম না।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সাংবাদিকতায় নবযুগ সঞ্চার করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরাধীন ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক গোলামির বিরুদ্ধে তিনি যেমন তার কবিতায় সোচ্চার ছিলেন, তেমনি তার সম্পাদিত পত্রপত্রিকায় তিনি সর্বাত্মক স্বাধীনতার দাবিকে সাকার করে তুলেছেন। নজরুলের সাংবাদিকতা ছিল সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক অবিরাম যুদ্ধ। তার সম্পাদিত 'ধূমকেতু' পত্রিকা উপমহাদেশে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিকে প্রথম উচ্চারণ করেছিল।
২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশবিরোধী সাহসিকতা
আবদুল হাই শিকদার মনে করেন, মাত্র ২৩ বছর বয়সে নজরুল ব্রিটিশবিরোধী অবস্থান নিয়ে যে সাহসিকতার পরিচয় দেন, তা ইতিহাসে বিরল। নজরুলের সাংবাদিক জীবন ও চলচ্চিত্রচর্চা নিয়ে গবেষণার ঘাটতির বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, নজরুলের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো বাংলাদেশে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। অথচ এই বিষয়ে গবেষণা বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
অসম্প্রদায়িক কাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, 'ধূমকেতু' পত্রিকায় যেমন মহরম নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল, তেমনি শারদীয় দুর্গাপূজাও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন। তার সাংবাদিকতা তথা পত্রিকার সঙ্গে আর কারো তুলনা চলে না। কেবল উল্লেখ করা যায় মওলানা ভাসানীর 'হক কথা' পত্রিকার কথা।
নজরুলের সাংবাদিকতায় নতুন ধারা
বাংলা সাহিত্য, সংগীত, নাটক, উপন্যাস, শিশু সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় নজরুল যে নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, তা আজও অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের জাতীয় চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে নজরুল অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছেন। বক্তারা জানান, নজরুলের 'ধূমকেতু', 'লাঙল', 'গণবাণী' - এমন এক একটি সংবাদ-সাময়িকপত্র ছিল এক একটি মহাবিদ্রোহের নাম। তারা বলেন, নজরুল তার সংবাদপত্রে হিন্দু-মুসলমান মিলনের বার্তা যেমন দিয়েছেন, তেমনি ঈদসংখ্যা, শারদীয় সংখ্যা, মহররম সংখ্যা প্রকাশের যুগান্তকারী পদক্ষেপও নিয়েছেন সেসব পত্রপত্রিকায়। বলা যায় নজরুলই আমাদের গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব।
স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। তিনি বলেন, নজরুলের সাংবাদিকতার সঙ্গে সাহিত্যকর্মের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। তার সম্পাদিত সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় রচনাসমূহের সংকলন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সমসাময়িক প্রসঙ্গ ধারণ করেও সেসব রচনা চিরকালীন আবেদনে ভাস্বর। নজরুল বহুলপঠিত হলেও তার সাংবাদিকসত্তা আমাদের সাহিত্য-পরিসরে তেমন একটা আলোচিত বিষয় নয়। বাংলা একাডেমির আজকের সেমিনার এ বিষয়ে আমাদের নতুন ধারণা দেবে বলে আশা করা যায়।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ড. ইসরাইল খান
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. ইসরাইল খান বলেন, সংবাদপত্রকে সাহিত্যিক ও শৈল্পিক করে জনগণের মনের গহীনে প্রবেশের কলাকৌশল বাংলার একজন অন্যতম প্রধান শিল্পী নজরুল খুব ভালো করেই জানতেন। তিনি জানতেন মানুষের হৃদয়তন্ত্রীতে স্থায়ী আসন গড়ে তোলার কৌশল। তাই তার সাংবাদিকতার নমুনা এখনো গবেষণার আকর বিষয়রূপে সমাদৃত। তিনি বলেন, কবি নজরুলের সাংবাদিক-কর্মগুলোর শাশ্বতরূপ খোঁজার জন্য অনেক অনেক দীর্ঘ সময় নেওয়া যায়। কিন্তু আজ আর তার খুব বেশি প্রয়োজন নেই। নজরুল ইসলাম 'নবযুগ', 'ধূমকেতু', 'গণবাণী' প্রভৃতিতে যত কবিতা ও বিবিধ রচনা লিখেছিলেন তা তার রচনাবলিতে স্থায়ী সাহিত্যমূল্য লাভ করেছে। কৌতূহলী কেউ যদি পত্র-পত্রিকায় সমকালীন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে রচিত সাংবাদিক নজরুলের লেখাগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য নিরূপণের প্রয়াস পান, তাহলে তিনি আরও আনন্দদায়ক তথ্য-উপকরণ আবিষ্কার করতে পারবেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক
সভাপতির বক্তব্যে বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, নজরুলের সাংবাদিকতা আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, তিনিই সংবাদপত্রের মাধ্যমেই ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা বলেছেন। শুধু তাই নয়, তার সম্পাদিত প্রতিটি পত্রিকার পাতায় পাতায় তিনি শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা প্রচার করেছেন। সাংবাদিক নজরুল এবং সাহিত্যিক নজরুল তাই নজরুলচর্চায় অবিচ্ছেদ্য আলোচ্য বিষয়।
মজিদ মাহমুদের আলোচনা
কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক মজিদ মাহমুদও নজরুলের সাংবাদিকতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেন। তিনি বলেন, নজরুলের সাংবাদিকতা আর আজকের সাংবাদিকতা এক নয়। আজ থেকে প্রায় একশত চার বা ছয় বছর আগের চিত্র-চরিত্র তথা সমাজ বাস্তবতায় তা মূল্যায়ন করতে হবে। তার ভাষ্যমতে নজরুলের সাংবাদিকতা নিছক সাংবাদিকতা নয়, বৈপ্লবিক দায়িত্বও বটে।
নজরুল পুরস্কার ২০২৬ প্রদান
আলোচনার এক পর্যায়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে গবেষণায় বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত 'নজরুল পুরস্কার ২০২৬' প্রদান করা হয়। গবেষক, সঙ্গীতশিল্পী ও অধ্যাপক রশিদুন্ নবী এবং নজরুলসংগীত-চর্চায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নজরুলসংগীত শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরার হাতে সম্মাননাপত্র, ক্রেস্ট এবং প্রত্যেককে পুরস্কারের অর্থমূল্য এক লক্ষ টাকার চেক তুলে দেন বাংলা একাডেমির সভাপতি, মহাপরিচালকসহ অতিথিবৃন্দ।
আলোচনা শেষে নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করেন বাচিকশিল্পী সীমা ইসলাম। নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী সুজিত মুস্তাফা ও ইয়াসমিন মুশতারী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সায়েরা হাবীব।



