বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব বর্জন করলেন অরুন্ধতী রায়, ইসরাইলি গণহত্যাকে রাজনৈতিক বলায়
বার্লিন উৎসব বর্জন অরুন্ধতী রায়ের, গণহত্যা ইস্যুতে প্রতিবাদ

বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব বর্জন করলেন অরুন্ধতী রায়

প্রখ্যাত ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায় বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। গাজায় ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ সম্পর্কে উৎসবের জুরি সদস্যদের দেওয়া ‘বিবেকহীন বক্তব্যের’ প্রতিবাদে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, রায় তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বাতিল করে এই প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

জুরির মন্তব্যে স্তম্ভিত লেখক

ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’-এ অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, বার্লিনাল জুরির চেয়ারম্যান প্রখ্যাত পরিচালক উইম ওয়েন্ডার্সসহ অন্য সদস্যদের সাম্প্রতিক মন্তব্য তাকে স্তম্ভিত করেছে। তারা বলেছিলেন, ‘শিল্প রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়’। ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’-এর লেখক রায় লিখেছেন, ‘একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ যখন আমাদের চোখের সামনে ঘটছে, তখন এ ধরনের কথা বলে সেই বিষয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

তিনি আরও লেখেন, ‘আমি মর্মাহত এবং বিরক্ত।’ তিনি মনে করেন, গাজা যুদ্ধ বন্ধ করতে ‘শিল্পী, লেখক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের তাদের ক্ষমতার মধ্যে থাকা সবকিছু করা উচিত।’ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমাকে এটি পরিষ্কারভাবে বলতে দিন: গাজায় যা ঘটেছে এবং যা ঘটছে, তা হলো ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চালানো একটি গণহত্যা।’

জুরি সদস্যদের বক্তব্য

গত বৃহস্পতিবার উৎসবের উদ্বোধনী প্যানেলে এক সাংবাদিক জুরি সদস্যদের কাছে গাজায় গণহত্যার বিষয়ে জার্মানি সরকারের ‘সমর্থন’ এবং মানবাধিকার ইস্যুতে ‘নির্বাচিত আচরণের’ তথা পক্ষপাতমূলক আচরণ বিষয়ে তাদের মতামত জানতে চেয়েছিলেন। উৎসবের সাত সদস্যের জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা উইম ওয়েন্ডার্স জবাবে বলেন, ‘চলচ্চিত্র নির্মাতাদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকা উচিত।’

ওয়েন্ডার্স বলেন, ‘আমরা যদি নিবেদিতভাবে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করি, তবে আমরা রাজনীতির ময়দানে প্রবেশ করি, কিন্তু আমরা রাজনীতির প্রতি ভারসাম্য। আমরা রাজনীতির বিপরীত। আমাদের কাজ মানুষের জন্য করা উচিত, রাজনীতিবিদদের জন্য নয়।’ আরেক জুরি সদস্য পোলিশ চলচ্চিত্র প্রযোজক ইওয়া পুশচিনস্কা বলেন, এই প্রশ্ন করাটা ‘কিছুটা অন্যায্য’। তার মতে, সরকার ইসরাইল নাকি ফিলিস্তিনকে সমর্থন করবে, তার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাতারা ‘দায়ী হতে পারেন না।’ পুশচিনস্কা আরও বলেন, ‘বিশ্বে আরও অনেক যুদ্ধ আছে যেখানে গণহত্যা ঘটছে, কিন্তু আমরা সেগুলো নিয়ে কথা বলি না।’

উৎসব ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

অরুন্ধতী রায়ের ১৯৮৯ সালের চলচ্চিত্র ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস’ উৎসবের ‘ক্লাসিকস’ বিভাগে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। ১২ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা এ উৎসবে তার অংশ নেওয়ার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পর ইসরাইলে অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম জার্মানি। দেশটি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে কথা বলাও বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

২০২৪ সালে পাঁচ শতাধিক আন্তর্জাতিক শিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মী জার্মানির অর্থায়নে পরিচালিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ বন্ধ করার আহ্বান জানান। তারা একে ‘ম্যাকার্থিবাদী নীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন যা ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিশেষ করে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশকে দমন করে।’ এই প্রেক্ষাপটে অরুন্ধতী রায়ের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।