জাপান-ইউনিসেফ চুক্তি: রোহিঙ্গা শিশু ও পরিবারের জন্য জীবনরক্ষাকারী সহায়তা
জাপান সরকার ও ইউনিসেফ মঙ্গলবার একটি নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু এবং তাদের পরিবারগুলোর জন্য জীবনরক্ষাকারী সহায়তা প্রদান করা হবে।
আর্থিক সহায়তা ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা
চুক্তি অনুযায়ী, জাপান সরকার ১৪ লাখ মার্কিন ডলার আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। এই তহবিলের মাধ্যমে ৫৬,৫০০-এর বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী উপকৃত হবেন, যাদের মধ্যে ৩৬,০০০-এর অধিক শিশু অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
এই অর্থায়ন নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোকে সমর্থন করবে:
- শিক্ষা সুবিধার প্রসার
- পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) কার্যক্রম
- পুষ্টি সহায়তা
- স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন
রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান অবস্থা
রোহিঙ্গা সংকট এখন নবম বছরে পদার্পণ করেছে এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম ও দীর্ঘস্থায়ী মানবিক পরিস্থিতিগুলোর একটি হিসেবে রয়ে গেছে। শরণার্থী শিবিরগুলোর বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো হলো:
- অতিরিক্ত জনবসতিপূর্ণ জীবনযাপনের পরিবেশ
- রোগের প্রাদুর্ভাবের ক্রমাগত ঝুঁকি
- পুষ্টিহীনতার ব্যাপকতা
- শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়া
এই অবস্থাগুলো শিশুদের নিরাপত্তা ও সুস্থ বিকাশের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে।
জাপানি রাষ্ট্রদূত ও ইউনিসেফ প্রতিনিধির বক্তব্য
বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি এবং ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এই নতুন অবদান নিশ্চিত করেছেন।
রাষ্ট্রদূত সাইদা বলেন, "বৈশ্বিক তহবিল হ্রাস পাওয়ার মধ্যেও জাপানের এই নতুন চুক্তি ঘোষণা করতে পেরে আমি আনন্দিত। এই সহায়তা শিক্ষা, ওয়াশ, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোতে মনোনিবেশ করবে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে জাপান দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, "জাপান সরকারের এই সহায়তা শিশুদের সুস্থ রাখতে ও শিক্ষার সাথে যুক্ত রাখতে, দক্ষতা উন্নয়নে উৎসাহিত করতে এবং পরিবারগুলোকে তাদের সর্বকনিষ্ঠ শিশুদের যত্ন নেওয়ার উপকরণ সরবরাহ করতে সহায়তা করবে।"
কার্যক্রমের বিস্তারিত পরিকল্পনা
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইউনিসেফ নিম্নলিখিত কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়ন করবে:
- ভাসানচরে মিয়ানমার পাঠ্যক্রমের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ
- কক্সবাজারে কিশোর-কিশোরীদের জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের সমর্থন
- কলেরা, ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাব কমানোর জন্য পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সুবিধা শক্তিশালীকরণ
- পরিবারগুলোতে সাবান ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী বিতরণ
স্বাস্থ্য সেবার সম্প্রসারণ
জাপানের সার্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজের অ্যাডভোকেসির সাথে সঙ্গতি রেখে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্নলিখিত স্বাস্থ্য সেবাগুলো সম্প্রসারিত হবে:
- শিশুদের পুষ্টিহীনতা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সেবা
- মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন
- ভাসানচরের নবজাতক স্থিতিশীলতা ইউনিট এবং কক্সবাজারের প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর সেবার মানোন্নয়ন
জাপানের পূর্ববর্তী অবদান
আগস্ট ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জরুরি অবস্থা শুরুর পর থেকে, জাপান বাংলাদেশে শরণার্থী প্রতিক্রিয়ার জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অবদান রেখেছে। এর মধ্যে ইউনিসেফের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশু ও পরিবারগুলোর সমর্থনে প্রায় ৪৭ লাখ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।
এই নতুন চুক্তিটি জাপান ও ইউনিসেফের মধ্যে ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের প্রতিফলন ঘটায়, পাশাপাশি মানবিক নিরাপত্তা ও সার্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজের প্রতি তাদের অঙ্গীকারকেও তুলে ধরে।
