কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে আরও একটি ঈদ কেটেছে দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা যখন আনন্দ, কোরবানি ও পারিবারিক মিলনে ব্যস্ত, তখন উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ঈদ এসেছে বিষাদের বার্তা নিয়ে। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় বিভিন্ন ক্যাম্পে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হলেও, প্রায় ১০ বছর ধরে নিজভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন লাখো রোহিঙ্গার জীবনে উৎসবের চিরচেনা আনন্দ নেই।
প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি
বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার অনেকেই এবারও ঈদ কাটিয়েছেন অভাব, হতাশা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে। একজন রোহিঙ্গাকেও এখনও স্থায়ীভাবে নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি। বরং দিন দিন বাড়ছে নতুন অনুপ্রবেশের চাপ। ২০২৫ সালের রমজানে কক্সবাজারের কুতুপালং শিবিরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার অনুষ্ঠানে সে সময়ের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, এই ঈদে না হোক, আগামী ঈদে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ঈদ করতে পারবে। জাতিসংঘ মহাসচিবকে পাশে রেখে দেওয়া সেই আশ্বাসে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল শিবিরে থাকা লাখো রোহিঙ্গা। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসনের কোনও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
নতুন অনুপ্রবেশ ও মানবিক সংকট
উল্টো নতুন করে দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সীমান্তের ওপারে আরও অনেকে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে। ঈদ এলেও শরণার্থী শিবিরগুলোতে নেই উৎসবের আমেজ। উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই মানবেতর জীবনযাপন করছে। খাবারের সংকট, নিরাপদ পানির অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
এ বিষয়ে টেকনাফের লেদা শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, কোরবানির ঈদ হলেও আমাদের ক্যাম্পে সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ধরনের মাংস সহায়তা পাওয়া যায়নি। টানা তিন বছর ধরে এ ধরনের সহায়তা বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া ঈদ এলেও আমাদের মাঝে তেমন আনন্দ কাজ করে না। কারণ নিজ দেশে ঈদ উদযাপন আর ভিনদেশে শরণার্থী হয়ে ঈদ পালন করার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারে আমাদের বাপ-দাদার কবর রয়েছে। যুগের পর যুগ সেখানে বসবাস করেছি। ঈদের নামাজ শেষে পরিবারের সবাই মিলে কবর জিয়ারত করতাম। এখন আর সেই সুযোগ নেই। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা যেন আগামী ঈদ নিজেদের মাতৃভূমিতে উদযাপন করতে পারে—এমন প্রত্যাশা তিনি করেন। সেই কথা শুনে আমাদের মাঝেও নিজ দেশে ফেরার স্বপ্ন নতুন করে জেগে উঠেছে।
তিনি বলেন, ঈদের নামাজে আমরা দোয়া করেছি, এটাই যেন বাংলাদেশে আমাদের শেষ ঈদ হয়। আগামী ঈদ যেন নিজভূমি আরাকানে পরিবার-পরিজন নিয়ে উদযাপন করতে পারি এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
অভাব-অনটনের মধ্যে ঈদ
টেকনাফের মৌচনী নতুন রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা সৈয়দ আলম বলেন, থাকা-খাওয়ার যে অবস্থা, সেখানে ঈদের কথা ভাবার সুযোগই নেই। ছেলেকে নতুন জামা কিনে দিতে পারিনি। পেটের খাবার জোগাড় করাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা। আগের চেয়ে এখন রেশনও কমে গেছে।
উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা দিল মোহাম্মদ বলেন, গত বছর বলা হয়েছিল ২০২৬ সালের ঈদ আমরা নিজ দেশ মিয়ানমারে উদযাপন করবো। কিন্তু এবারও কাঁটাতারের ভেতরেই বন্দি হয়ে ঈদ কাটাতে হচ্ছে।
মধুরছড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা ছোনো আরা বেগম দুই মাস আগে ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। ছেলের প্রথম ঈদ হলেও নতুন জামা কিনে দেওয়ার সামর্থ্য নেই তার। অভাব-অনটনের মধ্যেই সন্তানদের নিয়ে কোনোভাবে দিন পার করছেন তিনি।
সংগঠনগুলোর হতাশা
রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর নেতারাও প্রত্যাবাসন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, রোহিঙ্গাদের ঈদ মানেই এখন বিষাদের ঈদ। ক্যাম্পবন্দি জীবন খুব কঠিন। নিজভূমিতে ঈদ উদযাপনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্যাম্পগুলোতে হতাশা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। অনেকেই ভেবেছিল এবার হয়তো মা-বাবার কবর জিয়ারত করতে পারবে। কিন্তু সময় গড়ালেও সেই আশ্বাস বাস্তবে রূপ নেয়নি।
তহবিল সংকটে কোরবানির মাংস বিতরণ কমেছে
এদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, আশ্রয়শিবিরে বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত অনেক এনজিও তহবিল সংকটে রয়েছে। এ কারণে এবার কোরবানির পশুর সংখ্যা কমে গেছে। গত বছর দেড় কেজি করে মাংস বিতরণ করা হয়েছিল। এবার উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে থাকা দুই লাখ রোহিঙ্গা পরিবারে এক কেজি করে মাংস বিতরণ করা হবে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযান ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লাখো রোহিঙ্গা। পুরোনোদেরসহ বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি শরণার্থী শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।
বছরের পর বছর কাঁটাতারের ভেতর বন্দি জীবন কাটাতে কাটাতে রোহিঙ্গাদের কাছে এখন ঈদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা একটাই—নিজভূমি আরাকানে নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে ফিরে গিয়ে আবারও পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা।



