ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় সাইবার দাসত্ব: ফিরে এসে মামলা
ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় সাইবার দাসত্ব

ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে একটি চাইনিজ স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ এনে দেশে ফিরে এক ভুক্তভোগী বিমানবন্দর থানায় মামলা করেছেন। মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)।

ভুক্তভোগীর বর্ণনা

ভুক্তভোগী জানান, চাইনিজ নাগরিক ঝো ওয়াং তাকে ময়লার ড্রেন ক্লিনারের কাজ করতে বাধ্য করে। কাজ না করতে চাইলে তাকে মারধর করে বলা হয়, ‘তোকে আমি ৩ হাজার ডলার দিয়ে কিনে এনেছি। কাজ না করলে সেই টাকা ফেরত দিতে হবে। না হলে মেরে ফেলবে।’ টাকার জন্য তাকে বেঁধে ভিডিও কলে দেশে পরিবারকে নির্যাতনের দৃশ্য দেখানো হয়, ফলে পরিবার টাকা দিতে বাধ্য হয়।

পরিসংখ্যান

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন কর্মী চাকরি নিয়ে কম্বোডিয়া যান। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুন মাসেই পরপর চারদিনে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে ২২১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে ১২ জুন ৩৭ জন, ১৩ জুন ৫৪ জন এবং ১৭ জুন ৭৮ জন ভুক্তভোগী শূন্য হাতে ফেরত আসেন। এছাড়া ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ৮ জন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরে আসেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাচারের কৌশল

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে কম্বোডিয়ার দূতাবাস না থাকলেও দিল্লি থেকে আগে ভিসা ইস্যু করা হতো। পাচারকারী চক্র থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় অবস্থিত কম্বোডিয়ার দূতাবাস থেকে ভিজিট ভিসা সংগ্রহ করে ভুক্তভোগীদের তৃতীয় দেশের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় পাচার করে। দালাল মামুন দীর্ঘদিন ধরে কম্বোডিয়ায় বসবাস করছেন, যার মাধ্যমে কয়েক হাজার বাংলাদেশি স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি হয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নির্যাতনের বিবরণ

ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের শারীরিক নির্যাতন করে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কাজ না করলে টর্চার সেলে নিয়ে বিদ্যুৎ শক দেওয়া হতো। সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালে চাইনিজ নাগরিকরা পালিয়ে যায়, এরপর তারা মুক্তি পান।

বিশেষজ্ঞের মতামত

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, “সাইবার স্ক্যাম নিয়ে সবার সচেতনতা জরুরি। এটি মানবপাচারের ভয়াবহ এক ধরন। ভালো চাকরির কথা বলে বিদেশে নিয়ে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো।” তিনি আরও জানান, কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের ফলে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তিন দিনে ২২১ জনের ফেরত আসা প্রমাণ করে—বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি এভাবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার।

কম্বোডিয়া সরকারের পদক্ষেপ

কম্বোডিয়া কর্তৃপক্ষ গত ১৭ জুন জানায়, প্রধানমন্ত্রী হুন মানেটের আদেশে এক হাজারের বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে ২০০-এর বেশি ভিয়েতনামি, ২৭ চীনা, তাইওয়ান থেকে ৭৫ জন এবং ৮৫ জন কম্বোডিয়ান রয়েছে। পুলিশ কম্পিউটার ও শত শত মোবাইল ফোন জব্দ করেছে। তথ্যমন্ত্রী নেথ ফেক্ট্রা জানান, পোইপেটে ৪৫ জন নারীসহ ২৭০ জন ইন্দোনেশিয়ানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত মে মাসে জানায়, চীনা অপরাধী দলগুলোর পরিচালিত সাইবার স্ক্যাম সেন্টারগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা আছে।