রাশিয়ার নতুন প্রস্তাব: ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার প্রস্তাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে রাশিয়া আবারও তেহরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। সোমবার (১৩ এপ্রিল) ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে বৈরিতা নিরসন এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মস্কো এই পারমাণবিক জ্বালানি গ্রহণ করতে প্রস্তুত।
শান্তি আলোচনা ও রাশিয়ার মধ্যস্থতা
গত সপ্তাহান্তে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর এই নতুন প্রস্তাব এসেছে। মূলত গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তা কাটিয়ে উঠতেই রাশিয়া এই মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ থাকা দেশ হিসেবে রাশিয়া এর আগেও একাধিকবার ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের কাছে রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল।
ক্রেমলিনের বক্তব্য ও মার্কিন প্রতিক্রিয়া
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট পুতিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে আলাপকালে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন। রাশিয়ার সেই প্রস্তাব এখনো বহাল রয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত এর ওপর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’ মস্কো মনে করছে, ইরানের ইউরেনিয়াম রাশিয়ার কাছে থাকলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আশঙ্কা দূর হবে এবং এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা অর্জন করা সহজ হবে।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে এক ফোনালাপ চলাকালে রুশ প্রেসিডেন্ট ইরান যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে এই ধারণাটি উত্থাপন করেছিলেন। তবে ট্রাম্প এই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এই ইউরেনিয়ামের মজুদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা এবং প্রয়োজনে স্থলপথে সেনা পাঠিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জনের ইঙ্গিতও দিয়েছে হোয়াইট হাউস।
হরমোজ প্রণালির অবরোধ ও কূটনৈতিক সমাধান
দিমিত্রি পেসকভ রাশিয়ার এই প্রস্তাবের পাশাপাশি হরমোজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধের হুমকির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি কার্যত বন্ধ হয়ে রয়েছে। রাশিয়া মনে করছে, সামরিক শক্তির আস্ফালন না করে কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান খুঁজলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
শান্তি প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শান্তি প্রক্রিয়া এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইসলামাবাদে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর উভয় পক্ষই এখন নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। ইরান তাদের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ করতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ইউরেনিয়াম গ্রহণের প্রস্তাবটি একটি মধ্যবর্তী সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে কি না, তা নিয়ে এখন কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন বা তেহরান—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত মস্কোর এই প্রস্তাবে সরাসরি সম্মতি জানায়নি। এই আলোচনা বিশ্ব শান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।



