ইরানে হামলায় রাশিয়ার সরাসরি সামরিক সহায়তা না দেওয়ার কারণ বিশ্লেষণ
ইরানে হামলায় রাশিয়ার সামরিক সহায়তা নেই কেন?

ইরানে হামলায় রাশিয়ার সরাসরি সামরিক সহায়তা না দেওয়ার পেছনের কারণ

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার ছয় দিন পার হলেও ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত রাশিয়া সরাসরি কোনো সামরিক সহায়তা দেয়নি। হামলার পরপরই রাশিয়া অবশ্য তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া এই হামলাকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে সশস্ত্র আগ্রাসন বলে মন্তব্য করেন।

কৌশলগত স্বার্থের সম্পর্ক

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে রাশিয়া অন্যতম হলেও বাস্তবে দুই দেশের সম্পর্ক মূলত কৌশলগত স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্কো ও তেহরান একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নর্থ–সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর, যা রাশিয়া, ভারত ও ইরানকে সংযুক্ত করবে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় এই প্রকল্প রাশিয়ার জন্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

সামরিক সহযোগিতা ও সীমাবদ্ধতা

সামরিক ক্ষেত্রেও ইরান রাশিয়াকে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে ‘শাহেদ’ ড্রোন সরবরাহের মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বড় ধরনের সুবিধা হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। এসব ড্রোনের উৎপাদনের বড় অংশ রাশিয়ায় হলেও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ইরানের ভূমিকা রয়েছে।

তবে এত সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সংঘাতে রাশিয়ার সরাসরি অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, রাশিয়া ও ইরান কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা জোটের অংশ নয়। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে ইসরাইলের একটি অলিখিত সমঝোতা রয়েছে—একটি পক্ষ অন্য পক্ষকে সরাসরি আক্রমণ করবে না। এ কারণেও মস্কো প্রকাশ্যে ইরানের পক্ষে সামরিকভাবে জড়াতে চাইছে না।

ইরানের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরান হয়ত ভেবেছিল রাশিয়া কেবল মৌখিক সমর্থন নয়, বরং সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তাও দেবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অনেকের মতে, ইরানের নেতৃত্ব এ বিষয়ে কিছুটা ভুল হিসাব করেছে।

রাশিয়ার সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি

অন্যদিকে, এই সংঘাত দীর্ঘ হলে রাশিয়ার কিছু সুবিধাও হতে পারে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে। এতে তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রাশিয়ার অর্থনৈতিক লাভ হতে পারে। পাশাপাশি বৈশ্বিক মনোযোগ ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সরে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে চলে যেতে পারে।

তবে ইরানের বর্তমান সরকারের পতন হলে তা রাশিয়ার জন্য বড় কৌশলগত ক্ষতি হতে পারে। কারণ, পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে যে দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়া সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তাদের মধ্যে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাতে সরাসরি সহায়তা না পেলেও রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকায় দুই দেশই একে অপরকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ধরে রাখতে চাইবে। তাছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতাও ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন হিসেবে বিবেচিত হয়।