রাশিয়ার শ্রম সংকট মেটাতে ভারতীয়দের উপর নির্ভরতা, যুদ্ধের প্রভাব ও নতুন চুক্তি
রাশিয়ার শ্রম সংকটে ভারতীয়দের ভূমিকা, যুদ্ধের প্রভাব বিশ্লেষণ

রাশিয়ার শ্রম সংকটে ভারতীয়দের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে ক্রেমলিন তীব্র শ্রম সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় মস্কোর প্রধান ভরসা হিসেবে এখন উঠে এসেছে ভারত। অতীতে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে শ্রমিক আসলেও বর্তমানে রাশিয়ার কলকারখানা ও কৃষি খামারে ভারতীয়দের উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

ভারতীয় অভিবাসীদের রাশিয়া যাত্রা

মস্কোর একটি ব্যস্ত বিমানবন্দরে সম্প্রতি একদল ক্লান্ত ভারতীয় অভিবাসীকে দেখা গেছে। উজবেকিস্তান হয়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তারা রাশিয়ায় পৌঁছেছেন কাজের সন্ধানে। তাদের মধ্যে একজন অজিত নামের শ্রমিক ইংরেজি ভাষায় জানান, তিনি আবর্জনা অপসারণ শিল্পে এক বছরের চুক্তিতে এসেছেন এবং বেতন বেশ ভালো বলে উল্লেখ করেন।

শ্রমিক ঘাটতির পরিসংখ্যান ও কারণ

রুশ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে অন্তত ২৩ লাখ শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পূর্বে ভিসা ছাড়াই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে প্রচুর শ্রমিক আসত, কিন্তু এখন সেই সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। মুদ্রার মান কমে যাওয়া, কঠোর অভিবাসন আইন এবং রুশ রাজনীতিকদের অভিবাসীবিরোধী বক্তব্যের কারণে মধ্য এশীয়রা আগ্রহ হারাচ্ছে।

ভারতের সাথে রাশিয়ার নতুন শ্রম চুক্তি

এই শূন্যস্থান পূরণে রাশিয়া এখন তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র ভারতকে বেছে নিয়েছে। ২০২১ সালে মাত্র ৫ হাজার ভারতীয়কে কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু গত বছর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭২ হাজারে। এটি দেশটিতে ভিসাভিত্তিক অভিবাসী কোটার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

ভারতীয় শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা

মস্কোর টেক্সটাইল কোম্পানি ব্রেরা ইনটেক্স-এ পর্দার কাপড় তৈরির কাজ করছেন ২৩ বছর বয়সী গৌরব। তিন মাস আগে ভারত থেকে আসা গৌরব বলেন, এখানে জীবন ও উপার্জন খুব ভালো। কোম্পানির মালিক ওলগা লুগোভস্কায়া জানান, অনেক ভারতীয় শ্রমিক শুরুতে সেলাই মেশিন চালানো না জানলেও মাত্র দুই-তিন মাসের প্রশিক্ষণে তারা দক্ষ হয়ে উঠছেন।

মস্কোর বাইরে সার্জিয়েভস্কি কৃষি খামারেও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে যুক্ত হয়েছেন ভারতীয়রা। সেখানে কাজ করছেন পাঞ্জাবের সাহিল (২৩)। তিনি বলেন, ভারতে টাকা কম, কিন্তু এখানে অনেক কাজ এবং আয়ও বেশি। ওই খামারে ভারতীয়রা মাসে গড়ে ৫০ হাজার রুবল (প্রায় ৬৬০ ডলার) বেতন পান, যা স্থানীয় রুশদের কাছে আকর্ষণীয় নয়।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

গত ডিসেম্বরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয়দের জন্য রাশিয়ায় কাজ করা সহজ হয়েছে। রাশিয়ার প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেনিস মান্তুরভ তখন বলেছিলেন, রাশিয়া অগণিত ভারতীয় শ্রমিক নিতে পারে। বর্তমানে রাশিয়ার উৎপাদন খাতে ৮ লাখ এবং পরিষেবা ও নির্মাণ খাতে আরও ১৫ লাখ শ্রমিকের প্রয়োজন।

মস্কো ও নয়াদিল্লির মধ্যকার এই নিবিড় অর্থনৈতিক সম্পর্কের নেপথ্যে রয়েছে রাশিয়ার সস্তা জ্বালানি তেল। তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভারতকে রুশ তেল কেনা বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বড় একটি বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ভারতকে রুশ তেল কেনা থেকে বিরত রাখতে পারে, তবে রাশিয়ার ভারতীয় শ্রমিক নেওয়ার আগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।