মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে অভিবাসী শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন, এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে অভিবাসী শ্রমিকদের বিপন্ন জীবন

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে অভিবাসী শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন, এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে জাঁতাকলে পড়েছেন পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক। একদিকে প্রাণের ঝুঁকি, অন্যদিকে কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবন, এই দুই সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বুধবার (১ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) ভুক্ত দেশগুলোতে অবস্থানরত শ্রমিকদের জীবন ও সামাজিক নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে।

সংঘাতের মধ্যেও জরুরি কাজ চালাচ্ছেন অভিবাসী শ্রমিকরা

সংস্থাটি বলছে, সংঘাতের মধ্যেও এই দেশগুলোর অর্থনীতি সচল রাখতে খাবার ও পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের মতো জরুরি কাজগুলো অভিবাসী শ্রমিকরাই করে যাচ্ছেন। কিন্তু আয় কমে যাওয়া, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এইচআরডব্লিউর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক উপ-পরিচালক মাইকেল পেজ বলেন, “উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিক একদিকে শারীরিক নিরাপত্তার হুমকি এবং অন্যদিকে কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। এই সংঘাত কাফালা ব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রম অধিকারের যে ফাঁকফোকরগুলো ছিল, সেগুলোকে আরও নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শ্রমিকদের সাক্ষাৎকারে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার প্রকাশ

সংস্থাটি বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশের ৩৮ জন শ্রমিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। কাতারভিত্তিক এক হাসপাতাল কর্মী বলেন, “কখনও রাতে, কখনও দিনে বিস্ফোরণ ঘটে। মাথায় সারাক্ষণ চিন্তা ঘোরে, কী হতে যাচ্ছে? দেশে আমি আমার সন্তানকে রেখে এসেছি।” ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে বেশ কয়েকজন অভিবাসী শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে আরব আমিরাতের আজমানে হামলায় কুপিয়ে আসা ধ্বংসাবশেষের আঘাতে মারা গেছেন সালেহ আহমেদ নামে এক বাংলাদেশি। বাহরাইনের হিদ শিল্প এলাকায় নৈশকালীন ডিউটি শেষে ফেরার পথে মাথায় স্প্লিন্টার লেগে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হন এ. এম. তারেক নামে আরেক বাংলাদেশি। এ ছাড়া কুয়েতে ড্রোন হামলায় পাকিস্তানি ও নেপালি কর্মীর মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আর্থিক সংকট ও দাম বৃদ্ধিতে জীবন দুর্বিষহ

সংঘাতের কারণে কাতার, কুয়েত ও আমিরাতের ছোট দোকানগুলোতে শাকসবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে। কুয়েতভিত্তিক এক শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, “আগে দুই মাসের যে বাজার দিয়ে চলতাম, এখন তা এক মাসও যায় না।” খাবারের দাম বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা নিয়ম অনুযায়ী খাবার ভাতা দিচ্ছেন না। কাতারের আইনে মাসে ৩০০ রিয়াল (প্রায় ৮২ ডলার) ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও ২০২১ সালের পর তা আর বাড়েনি। ফ্রি ভিসায় থাকা শ্রমিকদের অবস্থা আরও করুণ। বাহরাইনে বেকার হয়ে পড়া এক বাংলাদেশি শ্রমিক বলেন, “মাঝে মাঝে খাওয়ার টাকাও থাকে না। খাবারের সন্ধানে বাইরে বের হই, কিন্তু কাজ নেই। টিকে থাকার জন্য দেশ থেকে ২০ হাজার টাকা আনিয়েছি। জানি না এভাবে কতদিন চলবে।”

কর্মসংস্থান হ্রাস ও দেশে ফেরার পথ বন্ধ

সংঘাতের কারণে পর্যটন ও হোটেল ব্যবসায় ধস নামায় অনেক কর্মীকে বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে বা চুক্তি বাতিল করা হচ্ছে। আমিরাতভিত্তিক এক নেপালি শেফ জানান, “যেখানে ২৫-৩০ জন কর্মী ছিল, এখন সেখানে মাত্র ৩-৪ জন কাজ করছেন। অনেকে ৩ থেকে ৪ লাখ নেপালি রুপি খরচ করে কাজে এসেছিলেন, এখন তারা সর্বস্বান্ত।” কুয়েতের এক ট্যাক্সি চালক জানান, আগে যা আয় হতো এখন তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ হচ্ছে। বিমানবন্দরে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বা টিকিটের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় তারা দেশেও ফিরতে পারছেন না।

এইচআরডব্লিউর জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান

এইচআরডব্লিউ জিসিসি দেশগুলোকে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • আয় কমে যাওয়া শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে জরুরি তহবিল গঠন
  • সব শ্রমিকের জন্য বাধ্যতামূলক জীবন বিমা নিশ্চিত করা
  • স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে ইচ্ছুক শ্রমিকদের বিমানের টিকিটে সহায়তা দেওয়া
  • সংকটকালীন জরুরি নির্দেশনাগুলো শ্রমিকদের নিজস্ব ভাষায় প্রচার করা

মাইকেল পেজ বলেন, “হাজার মাইল দূরে এসে জীবন বাজি রেখে যারা উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রয়োজনীয় সেবা দিচ্ছেন, সেই শ্রমিকদের যুদ্ধের আগুনের মুখে ফেলে রাখা নিয়োগকর্তা ও সরকারগুলোর উচিত হবে না।”