লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি নাগরিকের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন
লিবিয়ায় বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আটক থাকা আরও ১৭৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরে এসেছেন। বাংলাদেশ দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) যৌথ উদ্যোগে বিশেষ ফ্লাইটে আজ বুধবার (১ এপ্রিল) ভোর ৫টার দিকে তারা ঢাকায় পৌঁছান। এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ত্রিপলীর তাজুরা ডিটেনশন সেন্টার থেকে ১১৩ জন এবং বেনগাজীর গানফুদা ডিটেনশন সেন্টার থেকে ৬২ জন বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
রাষ্ট্রদূতের তদারকি ও অভিবাসীদের করুণ অবস্থা
ত্রিপলীর মেতিগা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি তদারকি করেন লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. হাবীব উল্লাহ। তিনি তাজুরা ডিটেনশন সেন্টার থেকে আসা অভিবাসীদের বিদায় জানান এবং পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার জন্য লিবীয় কর্তৃপক্ষ ও আইওএম-এর প্রতি ধন্যবাদ জানান। দেশে ফেরা এই দলের মধ্যে ১৪ জন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন, যা তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
প্রত্যাবাসিতরা দেশে ফেরার প্রাক্কালে লিবিয়ায় নিজেদের মানবেতর জীবনের বর্ণনা তুলে ধরেন। তাদের ভাষ্যমতে, অনিয়মিত পথে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তারা মানবপাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি হয়েছেন। এ সময় মুক্তিপণের জন্য শারীরিক নির্যাতন, চরম খাদ্য ও পানির সংকট এবং অসহনীয় জীবনযাপনের শিকার হয়েছেন তারা। অনেকে জানিয়েছেন, ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দালালদের পেছনে তারা প্রায় অর্ধকোটি টাকা পর্যন্ত খরচ করেছেন। জমি-জমা বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হওয়ার এসব করুণ বর্ণনা শুনে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
রাষ্ট্রদূতের সান্ত্বনা ও নতুন জীবন গড়ার আহ্বান
রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. হাবীব উল্লাহ অভিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং তাদের সান্ত্বনা দেন। সাম্প্রতিক সময়ের নৌ-দুর্ঘটনাগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্তত জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরতে পারা আপনাদের জন্য সৌভাগ্য।’ একই সঙ্গে তিনি দেশে ফিরে নতুন করে জীবন গড়ার আহ্বান জানান। রাষ্ট্রদূত প্রত্যাবাসিতদের উদ্দেশ্যে বলেন, ভবিষ্যতে কেউ যেন আর এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ পথে বিদেশে পা না বাড়ান।
তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন যেন নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে লিবিয়ার দুর্বিষহ জীবনের অভিজ্ঞতা সবার কাছে তুলে ধরেন, যাতে অন্য কেউ এই ভুল পথে না যায়। তিনি আরও বলেন, ‘অনিয়মিত অভিবাসন ব্যক্তি ও পরিবারের ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’ দেশে ফিরে নিজেরা স্বনির্ভর হতে সরকারি ও বেসরকারি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণের পরামর্শ দেন রাষ্ট্রদূত।
দালালচক্র থেকে সতর্কতা ও আইনি ব্যবস্থা
পাশাপাশি, যারা দালালচক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছেন, তাদের দেশে ফিরে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, যাতে প্রতারক চক্র ভবিষ্যতে আর কাউকে এভাবে ঠকাতে না পারে। শেষ পর্যন্ত তিনি বৈধ ও নিরাপদ উপায়ে অভিবাসনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেন এবং বিদেশ যাত্রার পূর্বে সরকারি প্রক্রিয়ায় তথ্য যাচাই করে দালালচক্র থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনে সরকারের অঙ্গীকারের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



