৩০ বছর পর মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরলেন শরীয়তপুরের আমির হোসেন
৩০ বছর পর মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরলেন আমির হোসেন

৩০ বছর পর মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরলেন শরীয়তপুরের আমির হোসেন

দীর্ঘ তিন দশক মালয়েশিয়ায় নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে দেশের মাটিতে পা রাখলেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা আমির হোসেন। গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাতে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হন তিনি। ১৯৯৬ সালে জীবিকার সন্ধানে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন আমির হোসেন। প্রথম তিন বছর নিয়মিত যোগাযোগ রাখলেও পরবর্তী ২৭ বছর সম্পূর্ণ নিখোঁজ ছিলেন তিনি।

পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান

আমির হোসেন ও রোকেয়া বেগম দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। সংসারের অভাব দূর করতে ১৯৯৬ সালে পারিবারিক কৃষিজমি বিক্রি করে দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়া পাড়ি জমান আমির হোসেন। সেখানে রংমিস্ত্রির কাজ শুরু করলেও তিন বছর পর হঠাৎ করেই পরিবারের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রোকেয়া বেগম বলেন, "হঠাৎ করে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। গত ২৭ বছর ধরে তাঁকে বিভিন্নভাবে খোঁজার চেষ্টা করেছি। মানুষটা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন, তা–ও বুঝতে পারছিলাম না।"

সামাজিক মাধ্যমের ভিডিওতে শনাক্ত

ছয় মাস আগে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের একটি জঙ্গলে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় আমির হোসেনকে দেখতে পান দীপু নামের এক প্রবাসী ও সংবাদকর্মী বাপ্পি কুমার দাস। তাঁরা তাঁকে উদ্ধার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। ওই ভিডিও দেখে আমির হোসেনকে শনাক্ত করে তাঁর পরিবার। আমির হোসেনের ছেলে বাবু তালুকদার বলেন, "মালয়েশিয়াপ্রবাসী দীপু ও মালয়েশিয়ার সাংবাদিক পাপ্পি কুমার দাসের মাধ্যমে আমার বাবার সন্ধান পেয়েছি। বাবাকে ফিরে পেতে তাঁরা অনেক সহায়তা করেছেন।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দূতাবাস ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ

পরিবারের সদস্যরা ভিডিও পোস্টকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পর শুরু হয় আমির হোসেনকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা আমির হোসেনের ছবি ও তথ্য পাঠান নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে। তথ্য যাচাই শেষে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় চামটা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমির হোসেনের জন্মনিবন্ধন করা হয়। নড়িয়ার ইউএনও আবদুল কাইয়ূম বলেন, "ওই ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্যগুলো যাচাই শেষে আবার মালয়েশিয়া দূতাবাসে পাঠিয়েছি। তিনি দেশে ফিরে এসেছেন, পরিবারের কাছে আছেন।"

বিমানবন্দরে আবেগঘন মিলন

মালয়েশিয়া থেকে ট্রাভেল পাস পেয়ে গতকাল দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছান আমির হোসেন। বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি ও প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের সহায়তায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও পরিবারের সদস্যরা তাঁকে গ্রহণ করেন। রোকেয়া বেগম বলেন, "স্বামীকে এত বছর পর ফিরে পাওয়া আমার জীবনের একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা।" বিমানবন্দরের কার্যক্রম শেষে আমির হোসেনকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার কেরানীগঞ্জে তাঁর ছোট ছেলে শহীদুল ইসলামের বাসায়।

প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, "৩০ বছর ধরে একজন প্রবাসে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ২৭ বছর ধরে যোগাযোগ না থাকার ঘটনা ভীষণ বেদনাদায়ক। এই ঘটনা প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।" তিনি আরও যোগ করেন, "প্রত্যেক প্রবাসীর খোঁজ রাখা জরুরি। এই প্রযুক্তির যুগে প্রত্যেক প্রবাসীর ডেটাবেজ করা অসম্ভব নয়, বরং জরুরি।"

আমির হোসেনের তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে এবং তাঁরা শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। বড় ছেলে তিন বছর আগে মারা গেছেন। বেঁচে থাকা দুই ছেলে ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করেন। পরিবার জানিয়েছে, আমির হোসেন কিছুটা অসুস্থ থাকায় তাঁকে বিশ্রামে রাখা হয়েছে এবং শীঘ্রই চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হবে।