মহাবিশ্বের অসীম শূন্যতার বুকে এমন কিছু রহস্য লুকিয়ে থাকে, যা মানুষের জানা জ্ঞানকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। গ্যালাক্সি বা ছায়াপথগুলোর গঠন নিয়ে বিজ্ঞানীদের এত দিনের ধারণা বদলে দিয়ে সম্প্রতি মহাকাশে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বহীন তৃতীয় গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার মহাবিশ্বের অন্যতম এক গভীর রহস্যের সমাধান করতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডার্ক ম্যাটারহীন গ্যালাক্সির সন্ধান
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, মহাবিশ্বের প্রায় প্রতিটি গ্যালাক্সির সিংহভাগ ভরই সাধারণত তৈরি হয় এমন কিছু উপাদান দিয়ে, যা আমরা খালি চোখে বা কোনো টেলিস্কোপে দেখতে পাই না। গ্যালাক্সি গঠনের বর্তমান মডেল অনুযায়ী, গ্যালাক্সি ডার্ক ম্যাটারের বিশাল আস্তরণের ভেতরে তৈরি হয়। এই ডার্ক ম্যাটার মূলত একটি মহাজাগতিক কাঠামোর মতো কাজ করে, যা তার শক্তিশালী মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে সাধারণ পদার্থগুলোকে (গ্যাস, ধূলিকণা) একসঙ্গে টেনে এনে গ্যালাক্সি তৈরি করতে সাহায্য করে। আর তাই পৃথিবী থেকে প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত নতুন সন্ধান পাওয়া গ্যালাক্সিটি বিজ্ঞানীদের যেমন বিভ্রান্ত করেছে, ঠিক তেমনি দারুণভাবে চমকিত করেছে। এনজিসি ১০৫২-ডিএফ৯ নামের গ্যালাক্সিটির গতিবিধি ডার্ক ম্যাটার ছাড়াই নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
তিনটি গ্যালাক্সির অস্বাভাবিক শৃঙ্খল
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এর আগে আবিষ্কৃত ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বহীন অন্য দুটি গ্যালাক্সি ডিএফ২ ও ডিএফ৪ একই গ্যালাক্সির শৃঙ্খলে বা লাইনে অবস্থিত। মহাকাশে গ্যালাক্সিগুলো যেন একটি চেইনের মধ্যে হিরের টুকরার মতো পরপর সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে। যদিও এই গ্যালাক্সিগুলো কীভাবে ডার্ক ম্যাটার ছাড়া টিকে আছে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন, এই চেইন যদি কোনো অস্বাভাবিক উপায়ে তৈরি হয়ে থাকে, তবে এর লাইনে থাকা অন্য গ্যালাক্সিতেও ডার্ক ম্যাটার অনুপস্থিত থাকতে পারে। নতুন আবিষ্কৃত ডিএফ৯ গ্যালাক্সি বিজ্ঞানীদের সেই অনুমানকেই সত্য প্রমাণ করল।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির জ্যোতিঃপদার্থবিদ মাইকেল কেইম জানিয়েছেন, মহাবিশ্বের প্রায় প্রতিটি গ্যালাক্সিই ডার্ক ম্যাটার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু ডিএফ২, ডিএফ৪ এবং এখন ডিএফ৯ এই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। এই গ্যালাক্সিগুলো একসঙ্গে একটি তীব্র মহাজাগতিক সংঘর্ষের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল, যা সাধারণ পদার্থকে ডার্ক ম্যাটার থেকে আলাদা করে ফেলেছে।
ডার্ক ম্যাটার এমন এক রহস্য, যা মহাবিশ্বের প্রতিটি কোণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আমরা এখনো জানি না এটি আসলে কী, তবে এটি আমাদের মহাবিশ্বের কাঠামো গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানীরা নানা পরীক্ষা করে ডার্ক ম্যাটার কী জানার চেষ্টা করছেন। মহাকাশের সব দৃশ্যমান সাধারণ পদার্থ যেমন তারা, গ্রহ, গ্যালাক্সি, ব্ল্যাকহোল, ধূলিকণা এবং গ্যাসসহ সবকিছু হিসাব করার পরও দেখা যায়, যে পরিমাণ মহাকর্ষ বল বা মাধ্যাকর্ষণ টান কাজ করছে, তা ব্যাখ্যা করার জন্য এই দৃশ্যমান ভর যথেষ্ট নয়। তার মানে, সেখানে এমন কিছু একটা আছে যা এই অতিরিক্ত মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তৈরি করছে, কিন্তু আমরা তা দেখতে পাচ্ছি না। এটি কেবল মহাকর্ষ বলের মাধ্যমেই সাধারণ মহাবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এই রহস্যময় বস্তুটির নামই দেওয়া হয়েছে ডার্ক ম্যাটার। মহাবিশ্বে সাধারণ পদার্থের চেয়ে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ প্রায় ৫ গুণ বেশি।
ডার্ক ম্যাটার ছাড়া গ্যালাক্সি গঠনের চ্যালেঞ্জ
যেহেতু আমাদের মিল্কিওয়েসহ বেশির ভাগ গ্যালাক্সি ডার্ক ম্যাটারের বিশাল বলয়ের মধ্যে সুরক্ষিত থাকে, তাই বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে ডার্ক ম্যাটার ছাড়া গ্যালাক্সি গঠন অসম্ভব। ২০১৮ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটির জ্যোতিঃপদার্থবিদ পিটার ভ্যান ডোকুমের নেতৃত্বে একটি গবেষণাপত্রে যখন ডিএফ২ গ্যালাক্সির কথা প্রথম সামনে আসে, তখন বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, গ্যালাক্সিটিতে ডার্ক ম্যাটার ছিল না বললেই চলে। চমকের এখানেই শেষ নয়। ২০২২ সালে বিজ্ঞানীরা জানান, ডিএফ২ ও ডিএফ৪ মূলত প্রায় এক ডজন গ্যালাক্সির একটি সংকীর্ণ রৈখিক শৃঙ্খল বা চেইনের অংশ। আর ২০২৫ সালের পরের গবেষণায় দেখা যায়, এই চেইনের সব গ্যালাক্সি মহাকাশে একই গতিতে এবং একই উপায়ে ভ্রমণ করছে। বিজ্ঞানীরা যুক্তি দেন, যদি এই গ্যালাক্সিগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয় এবং তাদের দুটি যদি ডার্ক ম্যাটার ছাড়া আচরণ করে, তবে এই শৃঙ্খলের অন্যান্য গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যেও একই বৈশিষ্ট্য থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে মাইকেল কেইম বলেন, “ডার্ক ম্যাটারবিহীন গ্যালাক্সির এমন একটি লাইন বা শৃঙ্খল এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে গ্যালাক্সিগুলো একটি চরম এবং অভূতপূর্ব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। এটি ডার্ক ম্যাটারের আসল প্রকৃতি বোঝার জন্য নতুন জানালা খুলে দিয়েছে।”
ডার্ক ম্যাটারের বাস্তবতা প্রমাণ
নতুন এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের ডার্ক ম্যাটার আসলে কী তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে বলে মনে করেন পিটার ভ্যান ডোকুম। তিনি জানান, ডার্ক ম্যাটার কোনো কাল্পনিক বা বিকল্প মহাকর্ষ তত্ত্বের প্রভাব নয়, আসলে একটি বাস্তব ভৌত পদার্থ। বিশেষ করে বামন গ্যালাক্সির স্কেলে, যেখানে বিকল্প মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক রয়েছে, সেখানে এই আবিষ্কার ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বকে নতুন করে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সূত্র: দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল



