ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সংস্কার জরুরি: কোপেনহেগেন সম্মেলনের বার্তা
ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সংস্কার জরুরি

কোপেনহেগেন সম্মেলনে ইউরোপের প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনা

গত বছরের অক্টোবরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন, পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং ইউরোপের ২৮টি বড় কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী কোপেনহেগেনে জড়ো হন। সেখানে আয়োজিত কোপেনহেগেন প্রতিযোগিতা সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইউরোপ কীভাবে নিজের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখবে, তা নিয়ে আলোচনা।

চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গিয়ে মাখোঁ স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমরা ঠিক জানি আমাদের কী করতে হবে। বিভিন্ন নথিতে এটি আগেই নির্ধারিত আছে। এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা তা বাস্তবায়ন করব। এটি কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের বিষয়। আমি এটা জোর দিয়ে বলছি; কারণ, আমার মতে এই বছরের শেষটা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

দ্রাঘিও রিপোর্টে বিনিয়োগ ঘাটতি চিহ্নিত

মাখোঁর এ কথা তখন সঠিক ছিল এবং আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ইউরোপ সত্যিই জানে কী করতে হবে। এই সম্মেলনের এক বছর আগেই ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান মারিও দ্রাঘিও ইউরোপের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল—ইউরোপে প্রতিবছর প্রায় ২৮ বিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ৯২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগঘাটতি রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এর পর থেকে ইউরোপের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্য সংরক্ষণনীতি বাড়ছে, চীনের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে, আর নিরাপত্তাঝুঁকি ইউরোপের দৈনন্দিন জীবনের আরও কাছে চলে এসেছে। একই সঙ্গে ইউরোপ নিজেই ধীরগতির অনুমোদনব্যবস্থা, খণ্ডিত আইনকানুন এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের নানা বাধার কারণে নিজের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কোপেনহেগেন সনদ ও বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি

ইউরোপ এখন আর দেরি করার অবস্থায় নেই। ভালো দিক হলো, ইউরোপের ব্যবসায়ীরা এই সমস্যার সমাধানের অংশ হতে প্রস্তুত। কোপেনহেগেন প্রতিযোগিতা সম্মেলনে যে কোপেনহেগেন সনদ ঘোষণা করা হয়, তার পেছনে এ ধারণাই ছিল। এতে যুক্ত ২৮টি কোম্পানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যদি ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকেরা প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করেন, তবে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপে তাদের বিনিয়োগ গড়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াবে।

এয়ারবাস, সিমেন্স, এসএপি, থ্যালেস, সাব ও নভো নরডিস্কের মতো বড় কোম্পানিগুলো ইউরোপে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। কিন্তু বিনিয়োগ তখনই ফল দেবে, যখন সঠিক পরিবেশ থাকবে। শুধু টাকা থাকলেই ইউরোপ শক্তিশালী হবে না। উপযুক্ত শর্ত না থাকলে এই বড় সুযোগও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ব্যবসার জন্য দরকার সহজ নিয়ম, দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা, কম খরচের জ্বালানি, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং একটি কার্যকর অভ্যন্তরীণ বাজার।

বাস্তবায়নের দুর্বলতা ও অগ্রগতি হতাশাজনক

এ কারণেই কোপেনহেগেন অঙ্গীকারে শুধু বিনিয়োগের কথা নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কারের একটি পরিষ্কার দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোপেনহেগেন সম্মেলনের পর ইউরোপের অগ্রগতি হতাশাজনক। নতুন একটি প্রতিযোগিতা পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের মধ্যে মাত্র ৪টি পুরোপুরি গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ২১টি উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আটকে আছে। ফলে এগুলো এখনো নিয়মকানুন সহজ করতে, খরচ কমাতে বা নতুন বিনিয়োগ আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনের মধ্যে এখনো বড় ফাঁক রয়ে গেছে। যেসব ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে, সেখানেও সমস্যা আছে। গৃহীত চারটি উদ্যোগের মধ্যে তিনটিই সরলীকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও নতুন ও অসংগত নিয়ম অনেক সময় সেই সুফলকে নষ্ট করে দিচ্ছে। ইউরোপের আসল সমস্যা নীতির অভাব নয়, বরং বাস্তবায়নের দুর্বলতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখন স্পষ্ট—ইউরোপকে তার অভ্যন্তরীণ বাজার পুরোপুরি কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে।

লার্স সান্দাল সোরেনসেন ডেনিশ ইন্ডাস্ট্রির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত।