আপনি নিশ্চয়ই ২০১৯ সালের সেই বিখ্যাত ছবিটির কথা ভোলেননি? চারদিকে আগুনের রিংয়ের মতো দেখতে সেই ঝাপসা ব্ল্যাকহোলটি! হ্যাঁ, মানুষের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের কথাই বলছি, যার নাম মেসিয়ার ৮৭ বা সংক্ষেপে এম৮৭*। পৃথিবী থেকে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ আলোকবর্ষ দূরের সেই মহাজাগতিক দানব নিয়ে এবার আরও এক চমকপ্রদ খবর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
নাসার চন্দ্র এক্স-রে স্পেসক্রাফটের নতুন ছবি
নাসার বিখ্যাত চন্দ্র এক্স-রে স্পেসক্রাফট ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এই ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্র থেকে সজোরে বেরিয়ে আসা এক তীব্র জেট বা আলোর ফোয়ারার সবচেয়ে নিখুঁত ও বিস্তারিত ছবি তুলেছেন। আলোর কাছাকাছি বেগে চলা মহাজাগতিক এই জেটের স্রোত হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূর পর্যন্ত মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ছে!
কীভাবে তৈরি হচ্ছে এই আলোর ফোয়ারা
আমাদের সূর্যের চেয়ে সাড়ে ৬০০ কোটি গুণ ভারী এই এম৮৭* ব্ল্যাকহোলটি তার আশপাশের গ্যাস ও ধুলোবালি রীতিমতো রাক্ষসের মতো গিলে খাচ্ছে। আর এই বিপুল পরিমাণ খাবার গিলে খাওয়ার সময় পদার্থের কিছু অংশ প্রচণ্ড বেগে ব্ল্যাকহোলের দুই মেরু দিয়ে বাইরের দিকে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আলোর কাছাকাছি বেগে চলা মহাজাগতিক এই জেটের স্রোত হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূর পর্যন্ত মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ছে!
এর আগেও অপটিক্যাল বা ইনফ্রারেড আলোতে এই জেটের ছবি তোলা হয়েছিল। কিন্তু এক্স-রে বা রঞ্জনরশ্মিতে এত নিখুঁত ছবি বিজ্ঞানীরা এই প্রথম পেলেন। কানাডার লাভাল ইউনিভার্সিটির গবেষক ও এই দলটির প্রধান ক্যামিল পোইত্রাস জানিয়েছেন, ‘আগে যেসব কাঠামোকে একসঙ্গে তালগোল পাকিয়ে থাকতে দেখা যেত, এক্স-রে ছবিতে এখন সেগুলোকে আলাদাভাবে খুব স্পষ্টভাবে চেনা যাচ্ছে। ফলে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই জেটের পরিবর্তন আরও নিখুঁতভাবে বোঝা সম্ভব হচ্ছে।’
আলোর চেয়ে বেশি বেগের বিভ্রম
এই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশটি হলো আলোর চেয়ে বেশি বেগের এক অদ্ভুত বিভ্রম! এক্স-রে ছবিতে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জেটের ভেতরের কিছু কিছু অংশ মনে হচ্ছে আলোর বেগের চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি বেগে ছুটছে!
আপনি হয়তো ভাবছেন, তাহলে কি অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হলো? কারণ, আইনস্টাইন তো বলে গিয়েছিলেন, ভর আছে এমন কোনো কিছুই আলোর বেগে বা তার চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না।
না, চিন্তার কোনো কারণ নেই, আইনস্টাইন মোটেও ভুল হননি। বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, মহাবিশ্বের কোনো নিয়ম এখানে ভাঙেনি। এটি আসলে একধরনের দৃষ্টিভ্রম! বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে সুপারলুমিনাল মোশন। যখন আলোর কাছাকাছি বেগে চলা কোনো মহাজাগতিক বস্তু মহাকাশে ঠিক আমাদের দিকেই ছুটে আসে, তখন এই অদ্ভুত দৃষ্টিভ্রমের সৃষ্টি হয়। দূরত্ব ও গতির অদ্ভুত এক জ্যামিতিক মারপ্যাঁচে দূর থেকে দেখে আমাদের মনে হয়, এটি যেন আলোর চেয়েও দ্রুত ছুটছে!
এই আবিষ্কার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
হার্ভার্ড অ্যান্ড স্মিথসোনিয়ানের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকসের জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যারিত শেলেনবার্গার বলেন, ‘এই পর্যবেক্ষণ আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে যে একটি ব্ল্যাকহোল কীভাবে তার চারপাশের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করে।’
আসলে, সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলগুলো তাদের গিলে খাওয়া বিপুল শক্তির একটা বড় অংশ এই জেটগুলোর মাধ্যমেই আবার নিজেদের গ্যালাক্সিতে ফিরিয়ে দেয়। এই শক্তিই একটি গ্যালাক্সির পরিবর্তন বা বেড়ে ওঠায় বড় ভূমিকা রাখে। চন্দ্র এক্স-রে স্পেসক্রাফটের এই নতুন ছবি বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করবে, কীভাবে এই কণাগুলো এত বিপুল শক্তি অর্জন করে এবং আলোর কাছাকাছি বেগে ছুটে যায়।
সম্প্রতি আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির ২৪৮তম সভায় এই চমকপ্রদ গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এটি প্রিপ্রিন্ট আর্কাইভেও প্রকাশিত হয়েছে। কে জানে, হয়তো আগামী দিনগুলোতে এই এম৮৭* ব্ল্যাকহোল আমাদের জন্য আরও নতুন রহস্যের দরজা খুলে দেবে!



