চাঁদের অদেখা অংশে আর্টেমিস-২ নভোচারীদের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা: মহাবিশ্বের তুলনায় মানবজাতির ক্ষুদ্রতা
চাঁদের অদেখা অংশে আর্টেমিস-২ নভোচারীদের বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা

চাঁদের অদেখা অংশে আর্টেমিস-২ নভোচারীদের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা

সম্প্রতি আর্টেমিস-২ অভিযানের নভোচারীগণ এমন অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করিয়াছেন, যাহা মানবজাতির কেহ কখনো উপলব্ধি করে নাই। পৃথিবী হইতে প্রায় চার লক্ষ কিলোমিটার দূরে, চাঁদের অদেখা অংশে অবস্থান করিয়া তাহারা যেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, তাহা নাকি মানবমস্তিষ্ক সম্পূর্ণরূপে ধারণও করিতে পারে না।

মানবসভ্যতার সীমাবদ্ধতা ও বিস্ময়

‘আমরা এমন সকল দৃশ্য দেখিয়াছি, যাহা আগে কোনো মানুষ দেখে নাই—এমনকি (প্রায় ৫৭ বছর পূর্বে) অ্যাপোলো অভিযানের সময়ও নহে। আমাদের জন্য তাহা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর’–যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিকট এমনই অভিব্যক্তি প্রকাশ করিয়াছেন চন্দ্রাভিযান আর্টেমিস-২-এর নভোচারী কমান্ডার রিড উইসম্যান। এই বক্তব্য মানবসভ্যতার এই মৌলিক সত্যকেই পুনরায় স্মরণ করাইয়া দেয়—আমরা যতই উন্নত হই, মহাবিশ্বের তুলনায় আমরা কতই না ক্ষুদ্র! এবং আমাদের নূতন সকল উপলব্ধিই এখনো কত বিস্ময়ে ভরা! এই সকল নূতন উপলব্ধি আমাদের সীমাবদ্ধতারও সত্য প্রকাশ করিয়া দেয়।

বস্তুত, মানবজাতির পক্ষে সশরীরে চন্দ্রাভিযান যে কোনো সময়ই এক বিশাল ঘটনা। আর চাঁদের বুকে মানুষের পদচিহ্নের প্রথম কীর্তির বিশালত্ব কত অধিক—তাহা উপলব্ধি করিবার সবচাইতে ভালো উপায় হইল, ইহা বলা যায় যে নিল আর্মস্ট্রং বিংশ শতাব্দীর সেই অল্প কয়েক জন মানুষের মধ্যে একজন, যাহাকে এক হাজার বৎসর পর ত্রিশ শতকেও মানবজাতি স্মরণ করিবে!

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা

তবে আর্টেমিস-২ অভিযানের তাৎপর্য কেবল রোমাঞ্চ বা বৈজ্ঞানিক কৌতূহলে সীমাবদ্ধ নহে। ইহা একাধারে প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও প্রদর্শন, আবার রাজনৈতিক অভিসন্ধিরও প্রতিফলন। ইতিহাস স্মরণ করিলে দেখা যায়, ১৯৬৯ সালের অ্যাপোলো-১১ অভিযান শুধু বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নহে, বরং শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বিজয়ের প্রতীক ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আর্টেমিস কর্মসূচিও এক প্রকার ‘নূতন মহাকাশ প্রতিযোগিতা'র সূচক, যেইখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েই চাঁদের সম্পদ ও প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ।

অর্ধশতাব্দী পর পুনরায় চন্দ্রাভিযানের কারণ

এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়—যেই লক্ষ্য মানবজাতি অর্ধশতাব্দী পূর্বেই অর্জন করিয়াছে, তাহা পুনরায় অর্জনের জন্য এত প্রস্তুতি, এত ব্যয়, এত বিলম্ব কেন? ইহার উত্তর নিহিত রহিয়াছে আধুনিক প্রযুক্তির জটিলতা ও স্থায়িত্বের প্রশ্নে। অ্যাপোলো অভিযান ছিল এক দুঃসাহসিক কিন্তু অস্থায়ী প্রয়াস, অপরদিকে আর্টেমিস কর্মসূচি একটি দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে পরিকল্পিত।

  • চাঁদের কক্ষপথে মহাকাশ স্টেশন নির্মাণ
  • চন্দ্রপৃষ্ঠে স্থায়ী ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা
  • ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতি

এই সমস্তই একটি সুসংহত কৌশলের অংশ।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

এই অভিযানের আরেকটি দিক উপেক্ষা করা চলে না—তাহা হইল অর্থনৈতিক বাস্তবতা। অ্যাপোলো কর্মসূচিতে যেইখানে মার্কিন ফেডারেল বাজেটের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যয় হইয়াছিল, বর্তমানে সেই অনুপাত অনেকাংশে হ্রাস পাইয়াছে। তবু আর্টেমিস প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ডলার—যাহা ইহাকে এক ব্যয়বহুল কিন্তু উচ্চাভিলাষী উদ্যোগে পরিণত করিয়াছে।

স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নও অনিবার্য চলিয়া আসে—মানবসভ্যতার এই বিনিয়োগ কি শুধুই জ্ঞানের প্রসারের জন্য, নাকি ভবিষ্যৎ চন্দ্রসম্পদ দখলের পূর্বপ্রস্তুতি? চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে জলের সম্ভাব্য অস্তিত্ব, দুর্লভ খনিজসম্পদের প্রাচুর্য এবং মহাকাশে স্থায়ী উপস্থিতির কৌশলগত গুরুত্ব—এই সকল কারণই চাঁদকে পুনরায় প্রাসঙ্গিক করিয়া তুলিয়াছে। যদিও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোনো রাষ্ট্র চাঁদের মালিক হইতে পারে না, তথাপি ‘ব্যবহার’-এর অধিকার সকলেরই রহিয়াছে।

প্রস্তুতিমূলক অভিযান ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

আর্টেমিস-২ অভিযানের একটি বিশেষ তাৎপর্য হইল—মানুষ এই প্রথম সরাসরি চাঁদের অদেখা অংশ প্রত্যক্ষ করিতেছে। প্রযুক্তি বহু পূর্বেই সেই অঞ্চলকে চিত্রায়িত করিয়াছে; কিন্তু মানুষের চোখে দেখা—ইহা এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তবে আর্টেমিস-২ অভিযানে কোনো নভোচারী চাঁদের মাটিতে পদার্পণ করিবেন না। অর্থাৎ, ইহা মূলত প্ৰস্তুতিমূলক অভিযান। প্রকৃত অবতরণের জন্য আমাদের অপেক্ষা করিতে হইবে আরো কয়েক বৎসর।

এই সকল বিষয় বলিয়া দেয়— মানবসভ্যতার এই সকল অগ্রগতি অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং প্রায়ই অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। ইহা যুগপৎ বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং রাজনীতিরও বিশেষ সম্মিলন বটে।