আর্টেমিস ২ মিশনে চাঁদের উল্টো পাশে ৪০ মিনিটের নীরবতা ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা
আর্টেমিস ২ মিশনে চাঁদের উল্টো পাশে ৪০ মিনিটের নীরবতা

আর্টেমিস ২ মিশনে চাঁদের উল্টো পাশে ৪০ মিনিটের নীরবতা ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশ সময় আজ ৭ এপ্রিল, মঙ্গলবার, মহাকাশ ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত সৃষ্টি করেছে আর্টেমিস ২ মিশন। এই মিশনের চার নভোচারী চাঁদের উল্টো পাশ দিয়ে উড়ে গেছেন, যা ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো মানুষকে আমাদের মহাজাগতিক প্রতিবেশীর এত কাছে নিয়ে গেছে। এই ঘটনাটি মহাকাশযাত্রার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও ভয়ের মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত, কারণ চাঁদের উল্টো পাশে যাওয়ার সময় পৃথিবীর সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার ৪০ মিনিট

ওরিয়ন স্পেসক্রাফট যখন চাঁদের উল্টো পাশে প্রবেশ করে, তখন প্রায় ৪০ মিনিট ধরে পৃথিবীর মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে নভোচারীদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। এই সময়ে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার ও পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল, এবং নভোচারীরা পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন। তবে, এই ৪০ মিনিট তাঁরা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকেননি; বরং এই সময়টাতেই তাঁরা সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন চাঁদের উল্টো পিঠের রহস্য উন্মোচনের কাজে।

চাঁদের উল্টো পিঠের রহস্য

চাঁদের যে পিঠটা আমরা পৃথিবী থেকে সব সময় দেখি, তার উল্টো পিঠটা একদম আলাদা। আমাদের দিকের পিঠে প্রাচীন লাভা প্রবাহের বিশাল সমতল প্রান্তর থাকলেও, উল্টো পিঠে এমন লাভার প্রান্তর প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানকার ভূত্বক অনেক বেশি পুরু, এবং গ্রহাণুর আঘাতে তৈরি হওয়া গর্ত বা ক্রেটারের সংখ্যাও অনেক বেশি। নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, চাঁদ এবং সূর্যের বর্তমান জ্যামিতিক অবস্থানের কারণে চাঁদের উল্টো পাশের মাত্র ২০ ভাগে সূর্যের আলো পড়েছে, যা এই মিশনে একটি অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ওরিয়েন্টাল বেসিনের গুরুত্ব

গবেষকদের আগ্রহের তালিকার শীর্ষে ছিল ওরিয়েন্টাল বেসিন, যা চাঁদের দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত ৯৩০ কিলোমিটার চওড়া একটি বিশাল গর্ত। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আজ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে একটি বিশাল গ্রহাণু চাঁদের বুকে আছড়ে পড়ার পর এটি তৈরি হয়েছিল। আর্টেমিস ২ মিশনের প্রধান বিজ্ঞানী কেলসি ইয়াং বলেন, ‘পুরো সৌরজগতে কীভাবে গ্রহাণুর আঘাতে গর্ত তৈরি হয়, তা বোঝার জন্য ওরিয়েন্টাল বেসিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি আদর্শ মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।’ এই বেসিনটি চাঁদের সামনের ও পেছনের দিকের ঠিক সীমানায় অবস্থিত, তাই নভোচারীরা এবার এর পুরো সৌন্দর্য সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

অন্যান্য পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা

এই ফ্লাইবাইয়ের সময় নভোচারীরা আরও কিছু গর্ত পর্যবেক্ষণ করেছেন, যেমন ৬৪ কিলোমিটার চওড়া ‘ওম’ ক্রেটার এবং ৯ কিলোমিটার চওড়া পিয়েরাজ্জো ক্রেটার। তাঁরা চাঁদের পৃষ্ঠে রঙের এবং উজ্জ্বলতার সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো খেয়াল করেছেন, যা রোবোটিক ক্যামেরার চেয়ে মানুষের চোখের সরাসরি পর্যবেক্ষণকে অনেক বেশি জীবন্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যাপার হলো, চাঁদের উল্টো পাশ দিয়ে ঘোরার সময় নভোচারীরা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একটি সূর্যগ্রহণ দেখতে পেয়েছেন, যেখানে চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি আড়াল করে রেখেছিল এবং তাঁরা সূর্যের করোনা পর্যবেক্ষণ করেছেন।

মিশনের প্রযুক্তি ও দূরত্ব

নভোচারীদের কাছে তিনটি নিকন ক্যামেরা ছিল ছবি তোলার জন্য, যার মধ্যে একটিতে ৪০০ মিলিমিটার পর্যন্ত জুম লেন্স লাগানো ছিল। চাঁদের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় ওরিয়ন ক্যাপসুলটি চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৬০০ কিলোমিটার ওপরে ছিল, এবং তখন জানালার বাইরে চাঁদকে দেখতে ঠিক একটা বাস্কেটবলের মতো মনে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আগে কেউ চোখে দেখেনি, যা মহাকাশ অনুসন্ধানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।