গ্রহদের জীবনচক্র: জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মহাজাগতিক রহস্য
গ্রহদের জীবনচক্র: জন্ম থেকে মৃত্যুর মহাজাগতিক রহস্য

গ্রহদের জীবনচক্র: জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মহাজাগতিক রহস্য

মানুষের যেমন জন্ম, মৃত্যু ও জীবনচক্র বিদ্যমান, ঠিক তেমনি মহাকাশের গ্রহগুলোরও নিজস্ব জীবনচক্র রয়েছে। তারা জন্মগ্রহণ করে, ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয় এবং একসময় তাদের মৃত্যুও ঘটে। কিন্তু একটি গ্রহ ঠিক কতদিন বেঁচে থাকবে, তা মূলত নির্ভর করে সে কোন ধরনের নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে তার ওপর।

গ্রহদের জন্মবৃত্তান্ত: ক্ষুদ্র ধূলিকণা থেকে বিশাল জগৎ

ফ্রান্সের বোরদো ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী শন রেমন্ডের মতে, গ্রহদের জীবনের সূচনা হয় অত্যন্ত ক্ষুদ্র অবস্থা থেকে। নতুন জন্ম নেওয়া নক্ষত্রের চারপাশে ঘূর্ণায়মান আণুবীক্ষণিক ধূলিকণাগুলো পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

বৃহস্পতি বা শনির মতো গ্যাসীয় দানবাকার গ্রহগুলোর কেন্দ্র প্রথমে বরফ ও পাথর দিয়ে গঠিত হয়। এরপর তারা মহাকাশ থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস আকর্ষণ করে নিয়ে দানবীয় আকার ধারণ করে। অন্যদিকে, পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহগুলো গঠন হতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় নেয়। নক্ষত্রের চারপাশের গ্যাসীয় বলয় সরে যাওয়ার পর বিভিন্ন আকারের গ্রহাণুর সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে এরা পূর্ণতা লাভ করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রহের মৃত্যু: ধ্বংস অথবা পরিবেশগত বিপর্যয়

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞানী ম্যাথিউ রেইনহোল্ড ব্যাখ্যা করেন, গ্রহের মৃত্যু বলতে মূলত দুটি বিষয় বোঝানো যায়। প্রথমত, গ্রহটি অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া। দ্বিতীয়ত, গ্রহটি তার পূর্বের বাসযোগ্য পরিবেশ সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলা। উদাহরণস্বরূপ, কোনো গ্রহে একসময় প্রাণের জন্য উপযোগী পরিবেশ থাকলেও পরবর্তীতে সেখানে কেবল উত্তপ্ত লাভা বা বরফের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই পরিবেশগত মৃত্যুও একপ্রকার মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পৃথিবীর শেষ পরিণতি: সূর্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক

পৃথিবীর আয়ু সরাসরি সূর্যের সঙ্গে জড়িত। সূর্যের কেন্দ্রে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম তৈরি করা হচ্ছে, যা আমাদের আলো ও তাপ সরবরাহ করছে। প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্যের ভেতরের এই হাইড্রোজেন জ্বালানি নিঃশেষ হয়ে যাবে।

শন রেমন্ডের মতে, তখন সূর্য ফুলেফেঁপে এক বিশাল রেড জায়ান্ট বা লাল দৈত্যে পরিণত হবে। পৃথিবীর মৃত্যু ঘটবে কয়েকটি ধাপে:

  1. সূর্যের তাপমাত্রা এতটাই বৃদ্ধি পাবে যে পৃথিবীর সমস্ত মহাসাগরের পানি ফুটে বাষ্পে পরিণত হবে, গ্রহটি হয়ে উঠবে এক জ্বলন্ত নরক।
  2. লাল দৈত্যে রূপান্তরিত সূর্য প্রসারিত হয়ে সম্ভবত পৃথিবীকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করবে।
  3. পৃথিবী যদি কোনোভাবে টিকে থাকে, সূর্যের মহাকর্ষীয় ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ায় এটি আন্তনক্ষত্রিক মহাশূন্যে ছিটকে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

গণনা অনুসারে, পৃথিবীর মোট আয়ু হবে প্রায় ৯৫০ কোটি বছর। তবে মহাবিশ্বের অনেক গ্রহ এর চেয়ে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারে, কারণ আমাদের সূর্য একটি মাঝারি আকারের হলুদ বামন নক্ষত্র। অন্যদিকে, মহাবিশ্বের অধিকাংশ নক্ষত্রই লাল বামন বা রেড ডোয়ার্ফ, যা আকারে ছোট, তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা এবং অত্যন্ত ধীর গতিতে জ্বালানি পোড়ায়। ফলে এরা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে সক্ষম।

নক্ষত্র বেঁচে থাকলেও গ্রহের অন্তর্নিহিত মৃত্যু

বিজ্ঞানী রেইনহোল্ড স্পষ্ট করে বলেন, নক্ষত্র দীর্ঘায়ু হলেও এর চারপাশের গ্রহগুলো তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কারণে মৃত্যুবরণ করবে। পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহগুলোর বাসযোগ্যতা বজায় রাখার জন্য টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া এবং কার্বন-সিলিকেট চক্রের মতো ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তা অপরিহার্য। এটি গ্রহের প্রাকৃতিক থার্মোস্ট্যাট হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ১৬ থেকে ৯০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে এই গ্রহগুলোর অভ্যন্তরীণ ম্যান্টল বা গলিত পাথরের স্রোত সম্পূর্ণরূপে শীতল হয়ে জমাট বাঁধবে। ফলে নক্ষত্র টিকে থাকলেও গ্রহটি ভেতর থেকে মরে গিয়ে একটি শীতল, প্রাণহীন পাথরের পিণ্ডে পরিণত হবে।

বড় নক্ষত্র ও গ্যাসীয় দৈত্যদের পরিণতি

এ-টাইপ নক্ষত্রের মতো বিশাল নক্ষত্রগুলোর আয়ু অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হয়—মাত্র ১০ কোটি থেকে ১০০ কোটি বছর। কারণ তারা দ্রুতগতিতে নিজেদের জ্বালানি শেষ করে ফেলে, ফলে তাদের চারপাশের গ্রহগুলোর আয়ুও খুবই সীমিত হয়।

অন্যদিকে, তীব্র বিকিরণের প্রভাবে অনেক সময় গ্যাসীয় দৈত্য গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল সম্পূর্ণরূপে উড়ে যেতে পারে। গ্রহটি তার নক্ষত্রের কতটা নিকটবর্তী এবং তার মহাকর্ষ বল কতটা শক্তিশালী, তার ভিত্তিতে কোটি কোটি বছর ধরে গ্যাসীয় গ্রহটি তার গ্যাস হারিয়ে একটি শুষ্ক পাথুরে গ্রহে রূপান্তরিত হতে পারে।

মহাবিশ্বের শেষ দিনগুলো: বিশৃঙ্খলা ও অন্ধকার

কোয়াড্রিলিয়ন বছর পর মহাবিশ্বে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। গ্রহগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে অথবা তারা তাদের নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ছিটকে বেরিয়ে যাবে। কোটি কোটি গ্রহ কোনো নক্ষত্র ছাড়াই ঘন অন্ধকার মহাশূন্যে অনন্তকাল ধরে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াবে। শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহের কী পরিণতি হবে, তা নির্ভর করবে আমাদের মহাবিশ্বের চূড়ান্ত ধ্বংসের প্রকৃতির ওপর।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: লাইভ সায়েন্স