জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের যুগান্তকারী আবিষ্কার: ভিন নক্ষত্রের বলয়ে স্ফটিকাকার বরফের সন্ধান
সৌরজগতের বাইরে থাকা নক্ষত্রগুলিতে বরফশীতল পানির অস্তিত্ব খুঁজে বের করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিশ্বের বিজ্ঞানীরা। এবার সেই অনুসন্ধানে যুগান্তকারী সাফল্য এসেছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে। এই টেলিস্কোপের অত্যাধুনিক নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত এইচডি ১৮১৩২৭ নক্ষত্রের ধুলিকণাযুক্ত বলয়ে স্ফটিক আকারের বরফের সরাসরি উপস্থিতি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রথমবারের মতো সরাসরি শনাক্তকরণ
বৃহস্পতি বা শনির উপগ্রহ এবং প্লুটোর মতো বামন গ্রহে বরফের উপস্থিতি একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হলেও, ভিনগ্রহের কোনো নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা বলয়ে এর আগে কখনোই সরাসরি বরফ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই অভূতপূর্ব আবিষ্কার সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী চেন সি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ এই নক্ষত্র বলয়ে পানির অস্তিত্বের পাশাপাশি স্ফটিকাকার বরফের দ্ব্যর্থহীন উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই বরফের গঠন অনেকটা আমাদের সৌরজগতের শনির বলয় বা কুইপার বেল্টে পাওয়া বরফের মতোই।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে স্পিৎজার স্পেস টেলিস্কোপ এই একই নক্ষত্র বলয়ে বরফ থাকার সম্ভাবনা ইঙ্গিত দিয়েছিল, কিন্তু সেই সময় এত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল প্রযুক্তির অভাবে তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের অসাধারণ দৃষ্টিশক্তি ধুলো ও পাথরের মাঝে লুকিয়ে থাকা অতি ক্ষুদ্র বরফকণাগুলোকেও সফলভাবে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পেরেছে।
গ্রহ গঠন প্রক্রিয়ায় বরফের ভূমিকা
বিজ্ঞানীদের মতে, নক্ষত্র বলয়ে বরফের উপস্থিতি শুধুমাত্র একটি আকর্ষণীয় আবিষ্কার নয়, বরং এটি সেখানে গ্রহ তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিজ্ঞানী চেন সি এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, এই বরফযুক্ত উপাদানগুলোই কোটি কোটি বছর পর সৃষ্টি হতে যাওয়া পাথুরে গ্রহগুলিতে পানির জোগান দিতে পারে। ঠিক যেভাবে পৃথিবীর জন্মের পর ধূমকেতু বা গ্রহাণুর মাধ্যমে পানি এসেছিল বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করে থাকেন।
আমাদের সূর্যের বয়স প্রায় ৪৬০ কোটি বছর, কিন্তু এইচডি ১৮১৩২৭ নক্ষত্রটি তুলনামূলকভাবে অনেক তরুণ। এই নক্ষত্রটির বয়স মাত্র ২ কোটি ৩০ লাখ বছর এবং এটি এখনও বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। এখানে পাথর, ধুলো এবং বরফখণ্ডগুলো ক্রমাগত একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে, যা একটি অত্যন্ত সক্রিয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিস্টিন চেন এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, এটি একটি অত্যন্ত সক্রিয় জগৎ, যেখানে বরফখণ্ডগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ফলে অতি ক্ষুদ্র বরফকণাগুলো ছড়িয়ে পড়ছে এবং জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ সেগুলো শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
বরফের বণ্টন ও তাপমাত্রার প্রভাব
এই নক্ষত্র বলয়ে বরফের বণ্টনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নক্ষত্রটির কাছাকাছি অঞ্চলে বরফের পরিমাণ মাত্র ৮ শতাংশ, কারণ সেখানে তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি বরফকে বাষ্পীভূত করে ফেলছে। কিন্তু বলয়ের বাইরের দিকে তাপমাত্রা অনেক কম থাকায় সেখানে বরফের পরিমাণ ২০ শতাংশের বেশি রয়েছে। এই পার্থক্য তাপমাত্রা ও বিকিরণের প্রভাব কীভাবে বরফের উপস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা বুঝতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করবে।
এই আবিষ্কার ভিনগ্রহে পানির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণাকে নতুন গতি দিয়েছে এবং মহাকাশে গ্রহ গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করছে। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও অনেক নক্ষত্র বলয়ে অনুরূপ বরফের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে, যা মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
