২০২৬ সালের প্রথম বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ: বাংলাদেশ থেকে দেখা যাবে না
প্রাচীনকাল থেকেই সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ মানবসভ্যতার কাছে বিস্ময়, কৌতূহল এবং কখনও কখনও ভয়ের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতির মাধ্যমে এখন আমরা জানি যে এই মহাজাগতিক ঘটনাগুলো আসলে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের নির্দিষ্ট জ্যামিতিক অবস্থানের ফলাফল। আজ মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে, বছরের প্রথম বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
গ্রহণের সময়সূচি ও দৃশ্যমানতা
বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বিকাল ৫টা ৫৬ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে এই গ্রহণ শুরু হবে এবং রাত ৮টা ২৭ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে শেষ হবে। তবে দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ থেকে এই গ্রহণটি দেখা যাবে না। সূর্যগ্রহণটি দৃশ্যমান হবে আর্জেন্টিনা, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে।
সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে গিয়ে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে পড়ে। এই অবস্থানে চাঁদ সূর্যের আলো আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ঢেকে দেয়। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই সরলরেখায় এমনভাবে অবস্থান করে যে চাঁদ সূর্যের দৃশ্যমান চাকতিকে পুরোপুরি আড়াল করে ফেলে।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, সূর্য চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বড় হলেও পৃথিবী থেকে তার দূরত্বও চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বেশি। এই অসাধারণ অনুপাতের কারণেই আকাশে সূর্য ও চাঁদ প্রায় সমান আকারের দেখায় এবং নির্দিষ্ট অবস্থানে এলে চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণরূপে ঢেকে দিতে সক্ষম হয়।
সূর্যগ্রহণের প্রকারভেদ
সূর্যগ্রহণ প্রধানত তিন ধরনের হয়ে থাকে:
- পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ: চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়। দিনের আলো হঠাৎ নিভে গিয়ে রাতের মতো অন্ধকার নেমে আসে। একই স্থান থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা খুবই বিরল— গড়ে প্রায় ৩৭৫ বছরে একবার ঘটে।
- বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ: চাঁদ যখন পৃথিবী থেকে তুলনামূলক দূরে থাকে, তখন তার আকার ছোট দেখায়। ফলে সূর্যকে পুরো ঢাকতে পারে না; মাঝখানে অন্ধকার চাকতি আর চারপাশে আগুনের আংটির মতো উজ্জ্বল বলয় দেখা যায়।
- মিশ্রগ্রহণ: এটি তুলনামূলক বিরল ধরনের গ্রহণ। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সেন্টার (আইএসি) জানাচ্ছে, সব সূর্যগ্রহণের মাত্র ৪ শতাংশ হয় মিশ্র ধরনের। কোনো কোনো স্থানে গ্রহণটি পূর্ণগ্রাস হিসেবে দেখা যায়, আবার অন্য স্থানে বলয়গ্রাসে রূপ নেয়।
চন্দ্রগ্রহণের ধরন ও বৈশিষ্ট্য
চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে অবস্থান করে এবং পৃথিবীর ছায়া চাঁদের ওপর পড়ে। সূর্যগ্রহণের বিপরীতে, চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীর যে কোনো স্থান থেকে দেখা যায় যদি তখন চাঁদ দিগন্তের ওপরে থাকে।
- পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ: চাঁদ পুরোপুরি পৃথিবীর ঘন ছায়ায় ঢুকে পড়ে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল নীল আলো ছেঁকে লাল আলো চাঁদের ওপর ফেলায় চাঁদ লালচে দেখায়, যাকে ‘ব্লাড মুন’ বলা হয়।
- খণ্ডগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ: চাঁদের একটি অংশ ছায়ায় ঢাকে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ বিরল, কিন্তু খণ্ডগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ঘটে অন্তত বছরে দুবার।
- পেনাম্ব্রা চন্দ্রগ্রহণ: চাঁদ পৃথিবীর হালকা ছায়া অংশ অতিক্রম করে; পরিবর্তন খুব সূক্ষ্ম হওয়ায় খালি চোখে বোঝা কঠিন।
নক্ষত্রের গ্রহণ: একটি অনন্য মহাজাগতিক ঘটনা
চিলির জ্যোতির্বিজ্ঞানী হুয়ান কার্লোস বিমিন তার সাম্প্রতিক বই ‘ইলাসট্রেটেড অ্যাস্ট্রোনমি’তে উল্লেখ করেছেন, গ্রহণ শুধু সূর্য ও চাঁদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। মহাজগতে ৫০ শতাংশ তারার অবস্থান দুই বা তার বেশি সংখ্যক তারার মাঝখানে। অনেক দূরের দ্বৈত নক্ষত্র ব্যবস্থায়ও গ্রহণ ঘটে। যখন একটি তারা অন্যটির সামনে আসে, তখন সাময়িকভাবে তার আলো কমে যায়— এটিও এক ধরনের গ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সব মিলিয়ে, গ্রহণ প্রকৃতির এক নিখুঁত বৈচিত্র্য ও মহাজাগতিক নিয়মতান্ত্রিকতার উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি কুসংস্কার বা ভয়ের বিষয় নয়, বরং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই আমাদের দেখায় যে এই মহাজাগতিক ঘটনাগুলো কতটা সুশৃঙ্খল ও মনোমুগ্ধকরভাবে সংঘটিত হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা দিন দিন এই রহস্যময় ঘটনাগুলোকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারছি এবং উপভোগ করতে শিখছি।
