মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে এক বিশেষ ধরনের বিপদ লুকিয়ে আছে, যা কোনো সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি দিয়ে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। আর বিপদটি হলো, এমন একজন নেতা, যাঁর হারানোর কিছুই নেই, অথচ তাঁর অধীন একটি আস্ত সেনাবাহিনী রয়েছে। আজকের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হলেন সেই নেতাই।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ও নেতানিয়াহুর অবস্থান
গত মার্চ মাস থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করে রাখা সংঘাতের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটন ও তেহরান গত বুধবার রাতে একটি সমঝোতা স্মারকে (অন্তর্বর্তী চুক্তি) সই করেছে। তবে এ চুক্তিতে ইসরায়েল কোনো পক্ষ ছিল না। নেতানিয়াহুও এটি অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি এ চুক্তির শর্ত মেনে চলতে কোনোভাবেই বাধ্য নন।
নেতানিয়াহুর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ আরও এক ধাপ এগিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) কোনো ‘সময়সীমা ছাড়াই’ লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় অবস্থান করবে।
চুক্তির বড় পরীক্ষা
মাসের পর মাস ধরে আলোচনা চলার পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যে চুক্তিটি সই হলো, সেটি বাস্তবে এখনই বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। আর এ পরীক্ষাটি নিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এমন এক পক্ষ, যাকে কখনোই এ চুক্তির বেড়াজালে বাঁধা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ওই রূপরেখা চুক্তি কার্যকর করার সব দায় সরাসরি ওয়াশিংটনের ওপর চাপিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহও সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে, মাসের পর মাস ধরে আলোচনা চলার পর যে চুক্তিটি সই হলো, সেটি বাস্তবে এখনই বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। আর এ পরীক্ষাটি নিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এমন এক পক্ষ, যাকে কখনোই এ চুক্তির বেড়াজালে বাঁধা সম্ভব হয়নি।
ধৈর্য হারাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট
নেতানিয়াহুর আগের অবাধ্যতাগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তফাত হলো, হোয়াইট হাউসের সুর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একসময় নেতানিয়াহুকে একজন শর্তহীন মিত্র হিসেবে গণ্য করতেন। তবে জানা গেছে, সম্প্রতি তিনি ব্যক্তিগত আলাপে নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি লেবাননে ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করে প্রকাশ্যে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি বলব, আরেকটু সংযত হয়ে কাজ করা সম্ভব। প্রতিবার কোনো হিজবুল্লাহ সদস্য একটি ভবনে ঢুকলেই হয়তো পুরো ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও কড়া ভাষায় কথা বলেছেন। ট্রাম্পকে গুরুত্ব না দেওয়ায় তিনি নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সদস্যদের তিরস্কার করেছেন। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে তাঁদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েলকে সরবরাহ করা অস্ত্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ‘মার্কিন করদাতাদের অর্থে তৈরি ও কেনা।’
এ সংঘাতের বহু আগে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হ্যান্স মর্গেনথাউ একটি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। বাস্তবসম্মত রাজনীতির নীতি অনুযায়ী, কোনো পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের সহনশীলতা কখনোই শর্তহীন হয় না। এটি মূলত স্বার্থের ওপর নির্ভর করে। আর ওয়াশিংটনের সেই স্বার্থ এখন স্পষ্টতই বদলে যাচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ ফাঁদ
বিদেশে নেতানিয়াহুর এ একগুঁয়েমি আসলে দেশের মাটিতে তাঁর রাজনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে জড়িত। ইরান যুদ্ধে নিজের নির্ধারণ করা বড় লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেননি তিনি। ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ঠেলে দেওয়ার পরও তেহরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন বা পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করার মতো কোনো লক্ষ্যই বাস্তবে রূপ নেয়নি।
ইরানে ইসরায়েলের হামলা ও সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানোর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে এবং একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের প্রতিবেশীদের জড়িয়ে যেকোনো যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রে যে ধরনের বৈশ্বিক উদ্বেগ তৈরি হয়, এখানেও ঠিক তা-ই হয়েছে। দেশের মাটিতে নেতানিয়াহু এমন এক ভোটাভুটি বা নির্বাচনের মুখোমুখি, যেখানে আগামী শরতে (অক্টোবর মাসে) ভোটাররা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও এখনো রয়ে গেছে। আবার, তাঁর জোট সরকার টিকে আছে এমন কিছু মন্ত্রীদের সমর্থনে, যাঁরা রাজনৈতিকভাবে খোদ নেতানিয়াহুর চেয়েও চরম উগ্রপন্থী। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ যুদ্ধের শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে এ সরকারকে চরম ব্যর্থ বলে অভিযুক্ত করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া কোনো চুক্তি মেনে নেওয়া শুধু যে অপ্রীতিকর তা-ই নয়, বরং এটি তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবেও মারাত্মক আত্মঘাতী হতে পারে; বিশেষ করে যখন সেই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তার পক্ষে কোনো দৃশ্যমান সাফল্য এনে দিচ্ছে না।
কেন তাঁকে বাগে আনা যাচ্ছে না
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের মূলে রয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। ওয়াশিংটনই ইসরায়েলকে অস্ত্র, অর্থ ও কূটনৈতিক সুরক্ষা দেয়। অথচ এ তিনটির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল একজন প্রধানমন্ত্রীকে নিজেদের শর্ত মানাতে পারে না তারা।
জন মিয়ারশেইমার ও স্টিফেন ওয়াল্টের মতো বাস্তববাদী গবেষকেরা তাঁদের ‘ইসরায়েল লবি’ সংক্রান্ত বিশ্লেষণে দীর্ঘদিন ধরে একটি যুক্তি দেখিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাঠামো ইসরায়েলি নেতাদের এমন এক ধরনের স্বাধীনতা দেয়, যা দেশটির অন্য কোনো মিত্র রাষ্ট্র পায় না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে ইসরায়েলের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলেও এ পরিস্থিতি বদলায় না।
তাই নেতানিয়াহুর টিকে থাকার ক্ষমতা কোনো রহস্য নয়, বরং এটি মার্কিন রাজনৈতিক কাঠামোরই অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির বড় দাতাগোষ্ঠী, যার মধ্যে অন্যতম শীর্ষ দাতা মিরিয়াম অ্যাডেলসন, মার্কিন সিনেটের ইসরায়েলপন্থী কট্টরপন্থী একটি অংশ ও চরমপন্থী গণমাধ্যমগুলো এখনো নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এ গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের চাপকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে তুলে ধরে।
চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার নেপথ্য কৌশল
নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তি প্রত্যাখ্যান না করেও কীভাবে তা ভেস্তে দিতে পারেন, তার একটি কৌশলগত পথ রয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এখনো চলছে। এসব হামলায় ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হিজবুল্লাহও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
এই সংঘাতের ধারাবাহিকতা ইরানকে আবারও যুদ্ধের দিকে টেনে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে, যে যুদ্ধ থেকে বের হতেই ইরান সম্প্রতি চুক্তিতে সই করেছে। তেহরানের আলোচকেরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, চুক্তির মূল দলিলে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এ চুক্তির মূল চেতনার অংশ। এখন যদি ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর হতাহতের সংখ্যা বাড়তেই থাকে এবং ইরান বুঝতে পারে যে ওয়াশিংটন তার নিজের মিত্রকে থামাতে পারছে না বা থামাবে না, তবে এই ভঙ্গুর ও নতুন চুক্তি মেনে চলার কোনো আগ্রহই তেহরানের থাকবে না। চুক্তিটি ছিঁড়ে ফেলার জন্য নেতানিয়াহুর কোনো প্রকাশ্য পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। তিনি শুধু লেবাননে এখন যা করছেন, তা চালিয়ে গেলেই হবে, বাকি কাজটা ইরানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।
মূলকথা
কূটনীতির ভাষায় এমন কিছু পক্ষ থাকে, যারা কোনো চুক্তিতে বাধ্য নয় এবং যাদের কোনো ভেটো দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ক্ষমতাও নেই, অথচ তারা পুরো চুক্তিটি নস্যাৎ করে দিতে পারে। এদের বলা হয় ‘স্পয়লার’ বা চুক্তি বিনষ্টকারী। নেতানিয়াহু এখন ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করছেন। তা তিনি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকেই করুন বা এই বিশ্বাস থেকেই করুন যে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সময়সীমার চেয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে, কোনো সংঘাত বা সংকটের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার পরও যে পক্ষকে কখনোই চুক্তিতে সই করতে বলা হয়নি, শুধু তাদের নীরবতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা যেকোনো শান্তিচুক্তি আসলে চরম ভঙ্গুর হয়ে থাকে।



