মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের তীব্রতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা ইরান ও লেবাননে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। গত সপ্তাহান্তে ইসরাইলি বিমান হামলায় তেহরানের তেল ডিপোগুলোতে বোমা বর্ষণের ফলে আকাশ কালো হয়ে যায় এবং বিষাক্ত ধোঁয়া শহরের লাখো নাগরিকের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই হামলার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অসুস্থতা, ক্যান্সার ও অকাল মৃত্যুর মাধ্যমে পরিলক্ষিত হতে পারে, যা ৯/১১-পরবর্তী মার্কিন অভিজ্ঞতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
যুদ্ধের প্রলয়ঙ্করী দৃশ্য
ইরানে হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া 'অপারেশন এপিক ফিউরি' একটি স্বনির্বাচিত যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হত্যা এবং একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ১৬৫ স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর মাধ্যমে সূচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গর্বভরে যুদ্ধের নিয়মকানুন প্রত্যাখ্যান করেছেন, বর্ণনা করেছেন কীভাবে ইরানি নেতারা আকাশে মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান শক্তি দেখতে পাচ্ছেন।
লেবাননে ইসরাইলি আক্রমণ
অন্যদিকে, ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননের বেসামরিক জনগোষ্ঠী ও রাজধানী বৈরুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ৭ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং মাত্র এক সপ্তাহে ৮৬ শিশুসহ প্রায় ৬০০ জন নিহত হয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এই হামলাগুলোকে 'সামরিক অভিযান' হিসেবে স্বাভাবিক করে উপস্থাপন করছে, যা গাজায় ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের সাথে মিল রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক স্বার্থ
ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে ইরানের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক যুদ্ধে যোগ দিয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত ছিল। যুদ্ধপন্থী রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম দাবি করেছেন যে, শাসন পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্য গঠিত হবে এবং তারা প্রচুর অর্থ উপার্জন করবে। তার মতে, ভেনেজুয়েলা ও ইরানের কাছে বিশ্বের ৩১ শতাংশ তেল মজুত রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করে চীনকে বঞ্চিত করার কৌশল হিসেবে এই যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ও বৈশ্বিক প্রভাব
এই যুদ্ধের পেছনে মার্কিন অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট 'এপস্টেইন' কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত, যেখানে ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তার জনসমর্থন হ্রাস পাওয়ায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন, যা ইউক্রেনে পুতিনের আক্রমণের মার্কিন সংস্করণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে একটি যুদ্ধের বৃত্ত সুদান থেকে শুরু করে ইয়েমেন, ইরান, লেবানন, রাশিয়া ও ইউক্রেন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া এবং তেল-গ্যাস হামলার প্রভাবে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ও সমাধানের পথ
ইরানি সামরিক বাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই যুদ্ধ শেষ করা কঠিন হতে পারে। অতীতের ইরাক ও লিবিয়া যুদ্ধের উদাহরণ দেখায় যে, শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধগুলো প্রায়ই দীর্ঘায়িত হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে। ইরানের গভীর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও ৯০ মিলিয়ন জনসংখ্যা এটিকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাখে।
রাজনৈতিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী জনমত গড়ে উঠছে এবং ইসরাইলে অভ্যন্তরীণ সমর্থন লক্ষণীয়। ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মন্তব্য করেছেন যে, তারা যুদ্ধের চক্র ভাঙতে চান। এখন প্রশ্ন হলো, এই সংঘাত কতদূর গড়াবে এবং বিশ্বকে এর জন্য কত মূল্য দিতে হবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার পরিবর্তনই সম্ভবত এই যুদ্ধের একমাত্র সমাধান হতে পারে, যদিও তার পরিণতি অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে।
