ইরানের পরমাণু চুক্তিতে ছাড় দেওয়ার প্রস্তুতি, কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্রে নমনীয়তা নেই
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির জন্য ছাড় দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুত ইরান। তবে দেশটি নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী মজিদ তাখত রাভানচি। তিনি রোববার সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা উল্লেখ করেন।
আলোচনার অগ্রগতি ও দ্বিতীয় ধাপের সম্ভাবনা
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চলমান উত্তেজনার মধ্যে সম্প্রতি পরমাণু চুক্তি নিয়ে ওমানের রাজধানী মাসকাটে প্রথম ধাপের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মজিদ তাখত জানান, এই আলোচনা কমবেশি ইতিবাচক দিকে এগিয়েছে, তবে কতটুকু সফল হয়েছে তা বলার সময় এখনো আসেনি। আগামীকাল মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় যোগ দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসবেন বলে গত শুক্রবার রয়টার্সকে জানিয়েছে একটি সূত্র। এ বৈঠকের মধ্যস্থতা করবে ওমানের একটি প্রতিনিধিদল। প্রথম বৈঠকের ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
ইরানের শর্ত ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ
গত সোমবার ইরানের পরমাণুপ্রধান বলেছিলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হয়, তাহলে নিজেদের কাছে থাকা সবচেয়ে পরিশোধিত ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমাতে রাজি তাঁরা। মজিদ তাখত বিবিসির কাছে পরমাণুপ্রধানের এই বক্তব্য তুলে ধরে ইরানের নমনীয় অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বাদ দেবে না।
পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে পরমাণু অস্ত্র বানাতে চায় ইরান। যদিও তেহরান তা বরাবরই নাকচ করে আসছে। এ নিয়ে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমাদের একটি চুক্তি ছিল, যেখানে তেহরান নিজেদের পরমাণু প্রকল্প সীমিত করার বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় বসে ২০১৫ সালে ওই চুক্তি থেকে সরে যান ট্রাম্প।
রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এ উত্তেজনা শুরু ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে শুরু হওয়া ওই বিক্ষোভ জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলে। বিক্ষোভকারীরা সরকার পতনে সক্ষম না হলেও তা সফল করতে একের পর এক হুমকি দিয়ে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। ইরানের সাবেক শাহর ছেলে রেজা শাহ পাহলভিও বিক্ষোভের পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
রেজা শাহ পাহলভি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত রয়েছেন। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরান ছেড়েছিলেন তিনি। শনিবার ট্রাম্প বলেন, ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়াটাই ‘সবচেয়ে ভালো উপায়’। এ বক্তব্যের পর শনিবার জার্মানির মিউনিখে এক সমাবেশে পাহলভি বলেন, তিনি ইরানে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ’ গড়ে তোলার জন্য নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত আছেন।
আন্তর্জাতিক বিক্ষোভ ও সামরিক পদক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ডাউনটাউন থেকে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মল পর্যন্ত বিভিন্ন সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ শনিবার বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁরা ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন। কানাডার টরন্টোয়ও অনুরূপ বিক্ষোভ হয়েছে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা ‘ট্রাম্প, এখনই পদক্ষেপ নিন’ স্লোগান দেন।
ইরানের বিক্ষোভ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সেনা মোতায়েন করেছেন ট্রাম্প। সেখানে আরও একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মিউনিখ সম্মেলনে জড়ো হওয়া সাংবাদিকদের পাহলভি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলছি,…ইরানের মানুষ আপনাকে বলতে শুনেছে যে তাদের জন্য সাহায্য আসছে। আপনার ওপর তাদের আস্থা আছে। তাদের সাহায্য করুন।’
এদিকে, মিউনিখ সমাবেশে উপস্থিত জনতা ‘জাভিদ শাহ’ স্লোগান দিচ্ছিলেন এবং সিংহ ও সূর্যের ছবিযুক্ত সবুজ, সাদা ও লাল রঙের পতাকা ওড়াচ্ছিলেন, যা ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের প্রতীক। সমাবেশে অংশগ্রহণকারী ৬২ বছর বয়সী ইরানি নাগরিক সাইদ এএফপিকে বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা একটি মৃত শাসনব্যবস্থা এবং এর অবসান হওয়া উচিত।
