২০০২ সালের ৩০ জুন জাপানের ইয়োকোহামা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে গ্রীষ্মের আলোয় ফুটবলের দুই মহাশক্তি ব্রাজিল ও জার্মানি মুখোমুখি হয়েছিল। অলিভার কান জার্মানির দুর্গ ছিলেন, অন্যদিকে রোনালদো নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় লড়াইয়ে নামেন। এই ফাইনাল শুধু ট্রফির জন্য ছিল না, এটি ছিল ফিরে আসার, বিশ্বাসের এবং ভাগ্যের বিরুদ্ধে জয়ের গল্প।
এশিয়ায় প্রথম বিশ্বকাপ
২০০২ বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যৌথভাবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়। ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে অনেকের সন্দেহ ছিল, কিন্তু দুই দেশ আধুনিক স্টেডিয়াম ও প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করে যে ফুটবল এখন সত্যিই বিশ্বব্যাপী। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেও ৩২টি দল স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল।
অঘটন ও চমক
উদ্বোধনী ম্যাচেই বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স সেনেগালের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায়। সেনেগালের ভয়হীন খেলা বিশ্বকে চমকে দেয়। ফ্রান্স গ্রুপপর্বে একটিও গোল করতে পারেনি এবং প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেয়। আর্জেন্টিনাও গ্রুপপর্ব পেরোতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে ব্রাজিল শুরু থেকেই ছন্দে ছিল, তুরস্ক, চীন ও কোস্টারিকার বিপক্ষে জিতে নয় পয়েন্ট অর্জন করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিস্ময়যাত্রা
গাস হিডিঙ্কের অধীনে দক্ষিণ কোরিয়া অসাধারণ ফিটনেস ও অদম্য বিশ্বাস নিয়ে খেলে। তারা ইতালি ও স্পেনকে হারিয়ে প্রথম এশীয় দল হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছে। তবে রেফারিং বিতর্ক এই যাত্রাকে ঘিরে থাকে। জাপানও প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে উঠে এশিয়ার ফুটবলের নতুন পরিচয় দেয়।
ব্রাজিলের পথ
ব্রাজিল বেলজিয়ামকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে মাইকেল ওয়েনের গোলে পিছিয়ে পড়েও রিভালদো সমতা ফেরান। এরপর রোনালদিনিওর ৪০ গজ দূর থেকে নেওয়া ফ্রি-কিক ইংলিশ গোলরক্ষক ডেভিড সিম্যানকে বিস্মিত করে এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় গোল হিসেবে স্থান পায়। লাল কার্ড পেলেও ব্রাজিল দশজন নিয়ে ম্যাচ জিতে যায়।
ফাইনাল
ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে জার্মানির অলিভার কান প্রথমার্ধে গোল শূন্য রাখেন। দ্বিতীয়ার্ধে রিভালদোর শট কান ঠিকমতো ধরতে না পারলে রোনালদো গোল করেন। কিছুক্ষণ পর রিভালদোর বুদ্ধিদীপ্ত পাসে রোনালদো দ্বিতীয় গোল করে ব্রাজিলকে ২-০ জেতান। এটি ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা। রোনালদো আট গোল করে গোল্ডেন বুট জেতেন এবং চার বছর আগের ফাইনালের হতাশা কাটিয়ে ওঠেন।
উপসংহার
২০০২ বিশ্বকাপ শুধু ব্রাজিলের জয় নয়, এটি এশিয়ার আত্মপ্রকাশ, সেনেগালের সাহস, দক্ষিণ কোরিয়ার বিস্ময়, অলিভার কানের বীরত্ব ও রোনালদোর প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্য। ফুটবলের ভৌগোলিক সীমা ভেঙে এই টুর্নামেন্ট প্রমাণ করে যে সবচেয়ে সুন্দর বিজয় আসে অন্ধকার সময় পার হয়ে।



