কিউবায় জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড বিপর্যয়: এক কোটি মানুষ বিদ্যুৎহীন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে সংকট তীব্র
কিউবায় জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণে গত সোমবার থেকে দেশটির প্রায় এক কোটি মানুষ বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এই সংকট এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর তেল আমদানি অবরোধ দেশটির পুরোনো ও জরাজীর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থাকে আগে থেকেই ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিউবার জাতীয় গ্রিড অপারেটর ইউনিয়ন ইলেকট্রিক (ইউএনই) জানিয়েছে, তারা এই 'ব্ল্যাকআউটের' সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করতে তদন্ত চালাচ্ছে।
নিয়মিত বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও সহিংস প্রতিবাদের সূত্রপাত
বর্তমানে কিউবায় মাঝেমধ্যেই বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটছে, যেখানে টানা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত 'ব্ল্যাকআউট' অবস্থা বিরাজ করছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জেরে গত সপ্তাহান্তে কমিউনিস্ট সরকারশাসিত দেশটিতে সহিংস প্রতিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল, যা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কিউবার প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বড় কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বিপর্যয়কে এবারের 'ব্ল্যাকআউটের' কারণ হিসেবে উড়িয়ে দিলেও, এখনো তাঁরা জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করতে পারেননি। তাঁদের ধারণা, ট্রান্সমিশন লাইনে কোনো গভীর সমস্যা থেকে এমনটা ঘটতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও তেল সরবরাহ সংকট
যুক্তরাষ্ট্র এ বছর তাদের শত্রুরাষ্ট্র কিউবার ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে, বিশেষ করে গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর পর। কিউবার বিদেশি সমর্থক ও সহায়তাকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাদুরো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন এবং কোনো দেশ যদি কিউবার কাছে তেল বিক্রি করে, তবে সে দেশের ওপর তিনি শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। ট্রাম্পের এই কঠোর অবরোধের ফলে কিউবার পুরোনো ও দুর্বল হয়ে পড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।
আলোচনা ও বিকল্প উৎসের সন্ধান
গত শুক্রবার কিউবা সরকার জানিয়েছে, এই সংকট সমাধানের আশায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। কয়েক দিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, কিউবা ধসে পড়ার দ্বারপ্রান্ত দাঁড়িয়ে আছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করতে আগ্রহী। তবে, তেলের সরবরাহে ঘাটতি বা বিদ্যুৎ গ্রিডে ব্যবস্থাপনাগত কোনো সমস্যার কারণেই হোক, কিউবার মানুষ অনেকটা নিয়মিত হয়ে ওঠা এই বিদ্যুৎবিভ্রাটের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে। হাভানার ২৬ বছর বয়সী বাসিন্দা দাইআনা মাচিন বলেন, 'না, এই খবরে আমি অবাক হইনি। আমরা এখন জাতীয় গ্রিডের বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছি এবং এভাবেই জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি।'
জ্বালানি সরবরাহের বর্তমান অবস্থা
এলএসইজি জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মাত্র দুটি ছোট জাহাজ জ্বালানি নিয়ে কিউবায় গেছে। প্রথম ট্যাঙ্কারটি জানুয়ারিতে মেক্সিকো থেকে হাভানার বন্দরে জ্বালানি সরবরাহ করেছে, যখন পর্যন্ত মেক্সিকো দ্বীপরাষ্ট্রটির নিয়মিত তেল সরবরাহকারী ছিল। দ্বিতীয় জাহাজটি জ্যামাইকা থেকে ফেব্রুয়ারিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে কিউবা গেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একসময় কিউবার অন্যতম তেল সরবরাহকারী ভেনেজুয়েলা থেকে এ বছর কিউবায় কোনো জ্বালানি যায়নি, যা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের প্রভাবকে স্পষ্ট করে তুলছে। কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট সার্কিট বা মাইক্রোসিস্টেমে বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপন শুরু করেছে, যা জাতীয় গ্রিডকে আবার সম্পূর্ণরূপে সচল করতে একটি প্রাথমিক কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
