চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধকালীন আলোচনার সময় তেহরানকে একটি চাঞ্চল্যকর পরোক্ষ সতর্কবার্তা দিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন। আলোচনা চলাকালীন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে ইসরায়েল হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে বলে সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস গত বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা
বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে এই শীর্ষ ইরানি আলোচকদের হত্যার পরিকল্পনা করছিল ইসরায়েল, এমনটাই বিশ্বাস ছিল কিছু মার্কিন কর্মকর্তার। এই আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেন, তারা যেন তেহরানকে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেন যে ইসরায়েল এই দুই নেতাকে নিশানা করতে পারে।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
গত শুক্রবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এই প্রতিবেদনটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “যথারীতি, ইসরায়েল এবং ইরানি আলোচকদের নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সর্বশেষ এই প্রতিবেদনটি একটি ভুয়া খবর। এটি বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিকৃতি।”
আলোচনার পথে বাধা
নিউ ইয়র্ক টাইমসের উদ্ধৃত কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুদ্ধ শুরু হয় এবং ইসরায়েল যখন একে একে ইরানের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে হত্যা করতে শুরু করে, তখন আরাঘচি এবং গালিবাফ তাদের নিশানা হতে পারতেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতেন এমন অন্যান্য শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা, যেমন জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজিকে ইতোমধ্যে হত্যা করেছে ইসরায়েল। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর আরাঘচি ও গালিবাফ যখন যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ইরানের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব শুরু করেন, তখন তাদের হত্যার যেকোনো চেষ্টা আলোচনাকে পুরোপুরি ভেস্তে দিতো এবং নতুন করে যুদ্ধ উসকে দিতো।
পাকিস্তানের ভূমিকা
এর আগে মার্চ মাসে যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানের অনুরোধের পর ইসরায়েল আরাঘচি এবং গালিবাফকে তাদের ‘হিট লিস্ট’ বা হত্যার তালিকা থেকে সরিয়ে নেয়। ওই কর্মকর্তা জানান, সে সময় ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছিল যে যদি এই দুই নেতার একজন বা উভয়ই নিহত হন, তবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকবেন না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এর ফলেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলিদের পিছু হটার নির্দেশ দেয়।
গালিবাফের প্রাণে বাঁচা
এর আগে ২০২৫ সালের জুনে এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন গালিবাফ অল্পের জন্য মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। উভয় ক্ষেত্রেই বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া ভবনের স্তূপ থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১২ এপ্রিল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে আলোচনা শেষে ইসলামাবাদ থেকে ইরান ফেরার পথে গালিবাফের ওপর পুনরায় সুনির্দিষ্ট ইসরায়েলি হামলার হুমকি তৈরি হয়। ইরান সে সময় ইসরায়েলি গুপ্তহত্যার আশঙ্কা করছিল এবং এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা চেয়েছিল। এমনকি ইরানি প্রতিনিধি দলকে সীমান্ত থেকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছে দিতে পাকিস্তানি ফাইটার জেট পাহারার ব্যবস্থা করেছিল।
জরুরি অবতরণ
দুই মার্কিন কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, ফেরার পথে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী গালিবাফের বিমানকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সতর্ক করে যে ইসরায়েল হামলার পরিকল্পনা করছে এবং ইরাক সীমান্ত দিয়ে দুটি ইসরায়েলি ফাইটার জেট ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সতর্কবার্তা পেয়ে বিমানটি উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদে জরুরি অবতরণ করে। পরবর্তীতে গালিবাফ এবং তার প্রতিনিধি দলের বাকি সদস্যরা আট ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে সড়কপথে তেহরানে ফিরে আসেন।



