১৯০৮ সালের ৩০ জুন, সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের আকাশ চিরে ধেয়ে আসে এক রহস্যময় বস্তু। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে এটি ওলট-পালট করে দেয় ওই এলাকার পুরো ভূপ্রকৃতি। তবে সেখানে কোনো গর্ত সৃষ্টি হয়নি, উদ্ধার করা যায়নি কোনো উল্কাপিণ্ডের অবশিষ্টাংশও। ঘটনার পর প্রায় দুই দশক পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানী বা অভিযাত্রী দল ওই দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে পারেনি। যা ছিল, তা হলো প্রত্যক্ষদর্শীদের কিছু বিবরণ। তাঁরা দেখেছিলেন সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল একটি জ্বলন্ত বস্তু, শুনেছিলেন বজ্রপাতের মতো একের পর এক বিকট শব্দ। সেই বিস্ফোরণে মাইলের পর মাইল বনাঞ্চল মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলা সেই রহস্য আজও উন্মোচন করা যায়নি।
ঘটনার বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
রুশ জার দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনকালে ১৯০৮ সালের ৩০ জুন সকাল সোয়া ৭টার দিকে মহাকাশ থেকে একটি বস্তু সাইবেরিয়ার বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। ওই অঞ্চলে মানুষের বসবাস ছিল খুবই কম। মূলত এভেনকি যাযাবর হরিণপালকেরা সেখানে বাস করতেন। তাঁদের দেওয়া বর্ণনা থেকেই এ ঘটনার প্রথম বিবরণ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা পরের এক শতাব্দী ধরে সেই বিবরণের সূত্র ধরেই পুরো ঘটনা বোঝার চেষ্টা করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আকাশে প্রথমে ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে একটি উজ্জ্বল অগ্নিগোলক ধেয়ে আসে। এরপর সূর্যের চেয়েও তীব্র এক আলো যেন পুরো আকাশকে ঝলসে দেয়। তার পরপরই শোনা যায় কান ফাটানো বিকট শব্দ। বিস্ফোরণস্থলের সবচেয়ে কাছে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তীব্র ধাক্কায় তাঁরা ছিটকে পড়েছিলেন। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ায় অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। একটু দূরে থাকা অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা আকাশে ধোঁয়ার বিশাল এক স্তম্ভ খাড়া ওপরের দিকে উঠে যেতে দেখেন।
বিস্ফোরণের অবস্থান ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
বিস্ফোরণটি ঘটেছিল রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার পূর্বে ইয়েনিসেইস্ক গভর্নরেটের (বর্তমান ক্রাসনোইয়ারস্ক ক্রাই) পোডকামেনায়া তুঙ্গুসকা নদীর কাছে। ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় ঘটনাটি ‘তুঙ্গুসকা ঘটনা’ নামে পরিচিত। জানা যায়, ওই অঞ্চলের বুনো হরিণের বিশাল দল এ বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিল। শত শত মাইল দূরে থাকা ভূমিকম্প পরিমাপক যন্ত্রেও এই বিস্ফোরণের ধাক্কায় তৈরি হওয়া কম্পন ধরা পড়েছিল।
বিজ্ঞানীরা এখন বিশ্বাস করেন, মহাজাগতিক বস্তুটি প্রায় ৩০ ডিগ্রি কোণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এরপর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উচ্চতায় এটি বিস্ফোরিত হয়। বস্তুটি সরাসরি মাটিতে আঘাত না করে বায়ুমণ্ডলেই বিশাল পরিমাণ শক্তি অবমুক্ত করে। নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী গবেষণা অধ্যাপক মার্ক বসলো এনডিটিভিকে বলেন, ‘আমরা বেশ জোরালভাবেই নিশ্চিত যে এটি একটি মেটিওরিটিক এয়ারবার্স্ট বা বায়ুমণ্ডলীয় উল্কাবিস্ফোরণ ছিল।’
গবেষণার বিলম্ব ও প্রথম অভিযান
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আড়ালে থাকা এই রহস্যের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হতেই প্রায় ২০ বছর লেগে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব ও পরে গৃহযুদ্ধের কারণে সাইবেরিয়ার এ নির্জন বনাঞ্চলের দিকে কারও নজর দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ১৯২১ সালে সোভিয়েত একাডেমি অব সায়েন্সেস ভূবিজ্ঞানী লিওনিড কুলিককে ওই এলাকায় পাঠায়। কিন্তু দুর্গম পথ ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। অবশেষে ঘটনার ১৯ বছর পর ১৯২৭ সালে সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হন তিনি।
দীর্ঘ দুই দশক পরও বনাঞ্চলে সেই বড় বিস্ফোরণের স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন রয়ে গিয়েছিল। বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরবর্তী সময়ে চিহ্নিত এলাকার কাছাকাছি গাছগুলো সোজা দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সেগুলোর কোনো ডালপালা বা ছাল ছিল না। অনেক গাছে পুড়ে যাওয়ার দাগও ছিল। তবে বারবার অভিযান চালানো সত্ত্বেও কুলিক সেখানে কোনো গর্ত বা উল্কাপিণ্ডের বড় কোনো অবশিষ্টাংশ খুঁজে পাননি, যা পাওয়ার আশা অনেকেই করেছিলেন।
প্রজাপতি আকৃতির বিন্যাস ও গুরুত্ব
এ ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি প্রথম দিকের কোনো অভিযান থেকে আসেনি। বরং তা জানা গিয়েছিল পরে আকাশ থেকে তোলা কিছু আলোকচিত্রের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল থেকে ২৩ থেকে ৫৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি সুনির্দিষ্ট প্রজাপতি আকৃতির বিন্যাসে লাখ লাখ গাছ উপড়ে পড়ে আছে। এই পুরো এলাকার আয়তন ছিল প্রায় ২ হাজার ১৫০ বর্গকিলোমিটার। অধ্যাপক মার্ক বসলো বলেন, ‘তুঙ্গুসকা ঘটনার ক্ষেত্রে এ প্রজাপতি আকৃতির বিন্যাস অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ এক আবিষ্কার। এটি গবেষণাগারে পরীক্ষা ও কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে হুবহু তৈরি করে দেখা সম্ভব। এটি আমাদের জানায় যে মহাজাগতিক সংঘর্ষের ফলে হওয়া বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণগুলো পারমাণবিক বিস্ফোরণের চেয়ে বেশ আলাদা হয়।’
বসলো আরও বলেন, ‘এ প্রজাপতি আকৃতির বিন্যাসের আকার ও ধরনটি মূলত নির্ভর করে ধেয়ে আসা বস্তুর শক্তি এবং সেটি কত ডিগ্রি কোণে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল তার ওপর। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের মহাজাগতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং দুর্যোগের পরিকল্পনা করার জন্য আমরা বিন্যাসটি ব্যবহার করতে পারি। এর মাধ্যমে কোন এলাকা কতটা বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব।’
চেলিয়াবিনস্কের ঘটনা থেকে সূত্র
তুঙ্গুসকা ঘটনার এক শতাব্দীর বেশি সময় পর, রাশিয়ার আকাশেই আরেকটি মহাজাগতিক বস্তু প্রবেশ করেছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে চেলিয়াবিনস্কের আকাশে একটি গ্রহাণুর বিস্ফোরণ ঘটে। ইন্টারনেটে সেই ঘটনার দৃশ্যগুলো অনেককে মুগ্ধ ও বিস্মিত করেছিল। চেলিয়াবিনস্কের সেই বিস্ফোরণ তুঙ্গুসকার চেয়ে আকারে অনেক ছোট ছিল। তবু এটি বহু মানুষকে আহত এবং ঘরবাড়ির জানালার কাচ ভেঙে চুরমার করে দেয়। ইতিহাসের সবচেয়ে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ ছিল এটি।
মার্ক বসলো বলেন, ‘তুঙ্গুসকার বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ চেলিয়াবিনস্কের ঘটনার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ (বা তারও বেশি) শক্তিশালী ছিল। এটি আরও খাড়া কোণে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল এবং অনেক গভীরে চলে এসেছিল। ফলে বিস্ফোরণটি ভূপৃষ্ঠের বেশ কাছাকাছি ঘটেছিল। কম উচ্চতা ও আকারে বড় বিস্ফোরণ হওয়ায় চেলিয়াবিনস্কের তুলনায় তুঙ্গুসকার ঘটনায় ভূপৃষ্ঠে অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।’ কানাডীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্টিন কনোর্স বলেন, ‘চেলিয়াবিনস্কে মূলত জানালার কাচের মতো সহজে ভেঙে যায় এমন জিনিসপত্র ধ্বংস হয়েছিল। কিন্তু তুঙ্গুসকায় আস্ত বনাঞ্চল মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। সৌভাগ্যবশত, তুঙ্গুসকার কাছাকাছি কোনো জনবসতি বা শহর ছিল না। যদি চেলিয়াবিনস্কের মতো কোনো বড় শহর সেখানে থাকত, তবে মানুষের প্রাণহানি হতো কল্পনাতীত।’
বস্তুর পরিচয়: গ্রহাণু নাকি ধূমকেতু?
তুঙ্গুসকা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিতর্কগুলোর একটি হলো, আসলে কোন বস্তু ধেয়ে এসেছিল? সেটি কি কোনো গ্রহাণু ছিল, নাকি ধূমকেতু? সূত্রের খোঁজে বিজ্ঞানীরা ঘটনাস্থলের গাছের আঠা, পিট কয়লার স্তর, আণুবীক্ষণিক কণা এবং আইসোটোপের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে দেখেছেন। তবে সুনির্দিষ্ট উত্তরটি এখনো পাওয়া যায়নি। মার্ক বসলো বলেন, ‘আমার মতে, এ বিতর্ককে একটু বেশিই বাড়িয়ে দেখা হয়েছে। গ্রহাণু ও ধূমকেতুর মধ্যকার পার্থক্য খুব অস্পষ্ট। কারণ, ধূমকেতুর বিভিন্ন অংশ অনেক সময় কক্ষপথের পরিবর্তনের কারণে গ্রহাণুর মতো আচরণ করতে পারে। আবার সময়ের সঙ্গে ধূমকেতুর বাষ্পীয় উপাদানগুলো উবে যাওয়ার পর সেগুলো দেখতে পুরোপুরি গ্রহাণুর মতোই হয়ে যায়।’
মার্টিন কনোর্স মনে করেন, ‘আমরা এই ঘটনা সম্পর্কে কত কম জানি এবং এটি নিয়ে এখনো কত বিতর্ক রয়ে গেছে, তা সত্যিই অবাক করার মতো। অত্যন্ত দুর্গম অবস্থানের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গবেষণা করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার অনেক বছর পর এটি নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু হয়।’
আধুনিক পদার্থবিদ্যার সমর্থন ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
আধুনিক কম্পিউটার মডেলিংয়ের বহু আগেই তুঙ্গুসকার বাসিন্দারা যা দেখেছিলেন, তার বিবরণ দিয়ে গেছেন। তাঁদের সেই বর্ণনায় আগুনের এক বিশাল স্তম্ভ, একের পর এক বিকট বজ্রধ্বনি এবং দিনের পর দিন রাতের আকাশ উজ্জ্বল হয়ে থাকার কথা বলা হয়েছিল। আশ্চর্যজনক বিষয়, আধুনিক পদার্থবিদ্যা এখন সেই পর্যবেক্ষণগুলো পুরোপুরি সমর্থন করে। মার্ক বসলো বলেন, ‘আগুনের সেই স্তম্ভের বিষয়টি মূলত ধেয়ে আসা উল্কাপিণ্ডের বাষ্পীভূত জ্বলন্ত উপাদানের সঙ্গে মিলে যায়, যা বস্তুটির বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পথ দিয়ে তীব্র বেগে ওপরের দিকে ছিটকে উঠেছিল। আর একের পর এক বিকট শব্দ হওয়ার কারণ হলো, বস্তুটি বায়ুমণ্ডলে ভেঙে টুকরা টুকরা হওয়ার সময় বিভিন্ন অংশ থেকে আলাদা আলাদা সময়ে তৈরি হওয়া শব্দের তীব্র ধাক্কা বা সনিক বুম।’
তুঙ্গুসকার ঘটনাকে এখন আর শুধু ইতিহাসের একটি বিচ্ছিন্ন বা অদ্ভুত ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। বিজ্ঞানীরা জানেন, ছোট আকারের মহাজাগতিক বস্তু নিয়মিতই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এবং এগুলোর বেশির ভাগই কোনো ক্ষতি না করে বাতাসে মিলিয়ে যায়। আসল দুশ্চিন্তা হলো, সেসব বড় বস্তুকে নিয়ে, যেগুলো ধ্বংসাত্মক বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো সময় পর্যন্ত টিকে থাকে। মার্ক বসলো বলেন, ‘টেলিস্কোপের বর্তমান পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা অনুযায়ী, কোনো বস্তু যদি দিনের বেলার আকাশ দিয়ে ধেয়ে আসে (যেমন তুঙ্গুসকা ও চেলিয়াবিনস্কের ক্ষেত্রে হয়েছে), তবে কয়েক বছর আগে রাতের আকাশে সেটি ধরা না পড়লে কোনো আগাম সতর্কতা পাওয়া সম্ভব নয়।’ তবে ‘নিও সার্ভেয়ার’ চালুর পর এ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।



