হোয়াইট হাউসের 'বন্দি' জীবন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা করতে পারেন না
হোয়াইট হাউসের 'বন্দি' জীবন: মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিষিদ্ধ কাজ

হোয়াইট হাউসের 'বন্দি' জীবন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা করতে পারেন না

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তার হাতে থাকে অসীম রাজনৈতিক শক্তি ও বৈশ্বিক প্রভাব। কিন্তু এই ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ধরনের 'বন্দি' জীবনযাপন, যেখানে তাকে মেনে চলতে হয় এমন কিছু কঠোর বিধিনিষেধ যা সাধারণ নাগরিকদের জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয়। সম্প্রতি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কার্লা মাস্ত্রাচ্চিও এবং সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ ডেভিন শিন্ডলারের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জীবনের অদ্ভুত ও চমকপ্রদ সীমাবদ্ধতাগুলো।

১. গাড়ি চালানোর সুযোগ নেই

প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টরা দায়িত্বকালীন সময়ে এমনকি দায়িত্ব ছাড়ার পরেও অনেক ক্ষেত্রে খোলা রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারেন না। নিরাপত্তার স্বার্থে সিক্রেট সার্ভিস সবসময় চালকের আসনে অবস্থান করে। লিন্ডন বি. জনসন ছিলেন শেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি নিজেই গাড়ি চালিয়েছেন। তবে ক্যাম্প ডেভিডের মতো সুরক্ষিত ব্যক্তিগত এলাকায় তারা সাইকেল চালানো বা হাঁটার সুযোগ পান, যা তাদের জন্য সামান্য স্বাধীনতার অনুভূতি এনে দেয়।

২. সাধারণ ইলেকট্রনিক ডিভাইসে নিষেধাজ্ঞা

নিরাপত্তার খাতিরে প্রেসিডেন্টরা বাজার থেকে কেনা সাধারণ স্মার্টফোন বা গ্যাজেট ব্যবহার করতে পারেন না। বারাক ওবামা তার প্রিয় ব্ল্যাকবেরি ব্যবহারের জন্য অনেক লড়াই করেছিলেন, যা পরে বিশেষভাবে সুরক্ষিত করে তাকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়। একইভাবে জো বাইডেনকেও তার অ্যাপল ওয়াচ বা পলেটন বাইক ব্যবহারের আগে কঠোর নিরাপত্তা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রতিটি ডিভাইসকে হ্যাকিং ও সাইবার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য বিশেষ প্রযুক্তিগত সুরক্ষা প্রদান করা হয়।

৩. সন্তানদের স্কুল বা অনুষ্ঠানে যোগদান

নিরাপত্তার এত কড়াকড়ি থাকে যে, প্রেসিডেন্ট চাইলেই তার সন্তানের স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা খেলাধুলা দেখতে যেতে পারেন না। তার উপস্থিতির কারণে সেখানে যে পরিমাণ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হয়, তাতে অন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। এ কারণেই অনেক প্রেসিডেন্টের সন্তান হোয়াইট হাউসের ভেতরেই পড়াশোনা করেছে, যেখানে বিশেষ শিক্ষক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিদ্যমান।

৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে 'ব্লক' করা

২০১৮ সালের একটি আদালতের রায় অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার ব্যক্তিগত সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে কাউকে ব্লক করতে পারেন না। একে নাগরিকদের 'বাক-স্বাধীনতা'র পরিপন্থি হিসেবে দেখা হয়। এছাড়া তাদের সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো সবসময় নজরদারিতে থাকে, প্রতিটি পোস্ট ও মন্তব্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচনা করা হয়।

৫. জানালা খোলার অনুমতি নেই

শুনতে অবাক লাগলেও, প্রেসিডেন্ট চাইলেই হোয়াইট হাউস বা তার গাড়ির জানালা খুলতে পারেন না। মিশেল ওবামা একবার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ আট বছর পর তিনি যখন গাড়ির জানালা খোলার সামান্য সুযোগ পেয়েছিলেন, সেটিই তার কাছে অনেক বড় স্বাধীনতার মতো মনে হয়েছিল। মূলত বাইরের আক্রমণ ঠেকাতেই হোয়াইট হাউসের জানালা সবসময় সিল করা থাকে, যা প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সীমিত করে।

৬. বাণিজ্যিক এয়ারলাইন ব্যবহার

প্রেসিডেন্ট চাইলেই সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানে ভ্রমণ করতে পারেন না। যদিও তার জন্য 'এয়ার ফোর্স ওয়ান'-এর মতো বিলাসবহুল ব্যবস্থা থাকে, তবুও সাধারণ মানুষের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে বিমানে ওঠার কোনো সুযোগ তার নেই। প্রতিটি ভ্রমণ পূর্ব-পরিকল্পিত হয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়, যা তার স্বতঃস্ফূর্ততা হ্রাস করে।

৭. নিজের অফিস পরিষ্কার করা

প্রেসিডেন্ট চাইলে তার নিজের অফিস পরিষ্কার করতে বা কোনো মেইল সরাসরি ডাস্টবিনে ফেলে দিতে পারেন না। 'প্রেসিডেন্সিয়াল রেকর্ডস অ্যাক্ট' অনুযায়ী, তার প্রতিটি ইমেইল এবং দাপ্তরিক কাগজ সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। স্টাফরা সেগুলো যাচাই-বাছাই করার পরই কেবল সরানোর অনুমতি মেলে, যা ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: টেকনিক্যালি সিক্রেট সার্ভিস প্রেসিডেন্টের আদেশের অনুগত। প্রেসিডেন্ট যদি কোনো বিপজ্জনক জায়গায় যেতে চান, তবে সিক্রেট সার্ভিস তাকে নিরুৎসাহিত করতে পারে কিন্তু আটকাতে পারে না। তবে আইনের মারপ্যাঁচে (১৮ ইউ.এস.সি. ৩০৫৬) প্রেসিডেন্ট কখনোই সিক্রেট সার্ভিসের সুরক্ষা নিতে অস্বীকার করতে পারেন না, যা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কিন্তু ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সীমিত করে।

সূত্র: রিডার’স ডাইজেস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী