মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা জিমি কিমেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবিসি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিভাজনমূলক বক্তব্য ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে নতুন বিতর্কের মধ্যেই এই ঘটনা ঘটেছে।
মেলানিয়ার অভিযোগ
গতকাল সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মেলানিয়া ট্রাম্প অভিযোগ করেন, জিমি কিমেল তাঁর কৌতুকের মাধ্যমে ‘যুক্তরাষ্ট্রে অসুস্থ ধারার রাজনীতিকে আরও তরান্বিত করছেন’। তিনি লেখেন, ‘জিমি কিমেলের মতো মানুষেরা প্রতি রাতে আমাদের ঘরে ঢুকে ঘৃণা ছড়াবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না। কাপুরুষের মতো এবিসির আড়ালে লুকিয়ে আছেন তিনি। এবার যথেষ্ট হয়েছে, এবিসিকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
ট্রাম্পের কঠোর দাবি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও কড়া দাবি তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ডিজনি ও এবিসির উচিত, জিমি কিমেলকে এখনই বরখাস্ত করা। প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডির পক্ষ থেকে কোনো কৌতুক অভিনেতাকে বরখাস্তের এমন দাবি যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন। মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী সরকারকে মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ করতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করে।
বিতর্কের সূত্রপাত
গত শনিবার ওয়াশিংটন ডিসির হিলটন হোটেলে হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাদের বার্ষিক নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। সেখানে ট্রাম্প দম্পতি ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ওই নৈশভোজে এক বন্দুকধারী গুলি চালানোর পর ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পকে হত্যার উদ্দেশ্যে এই হামলা করা হয়েছিল।
হামলার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিমি কিমেলের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাঁকে মেলানিয়া ট্রাম্পকে নিয়ে ব্যঙ্গ করতে দেখা যায়। ভিডিওটি ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
কিমেলের কৌতুক
ভিডিওটি ছিল মূলত হামলার আগে গত বৃহস্পতিবার সম্প্রচার হওয়া জিমি কিমেল শোর অংশবিশেষ। হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাদের বার্ষিক নৈশভোজকে ব্যঙ্গ করে তিনি তাঁর শোতে একটি নৈশভোজের আয়োজন করেন। সেখানে জিমি কিমেল বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে আছেন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া। দেখুন, ওনাকে কী চমৎকার দেখাচ্ছে। মিসেস ট্রাম্প, আপনাকে একজন হবু বিধবার মতো দীপ্তিময় দেখাচ্ছে।’
মেলানিয়া ট্রাম্পকে জনসমক্ষে প্রায়ই বিমর্ষ দেখা যায়, এমন একটি প্রচলিত ধারণাকে ঘিরেই মূলত কিমেল এই কৌতুক করেছিলেন। তবে ট্রাম্পের সমর্থকেরা এই মন্তব্যকে স্রেফ কৌতুক হিসেবে না দেখে শনিবারের ওই গুলির ঘটনার সঙ্গে মিলিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কৌতুক অভিনেতা কিমেলের এই মন্তব্যকে সরাসরি ‘সহিংসতার ঘৃণ্য উসকানি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মেলানিয়ার ডকুমেন্টারি নিয়েও বিদ্রুপ
কিমেল ফার্স্ট লেডির প্রামাণ্যচিত্র ‘মেলানিয়া’ নিয়েও বিদ্রূপ করতে ছাড়েননি। বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়া এই প্রামাণ্যচিত্র সমালোচকদের কাছেও তেমন প্রশংসা পায়নি। তাচ্ছিল্যভরে কিমেল বলেন, ‘আপনার এই বিশাল অর্জনের জন্য অভিনন্দন জানাই ম্যাডাম ফার্স্ট লেডি—এটি বিশ্বের প্রথম “স্থির চলচ্চিত্র”।’
পূর্ববর্তী ঘটনা
গত বছর একটি মন্তব্য করে বিপাকে পড়েছিলেন জিমি কিমেল। তিনি বলেছিলেন, রিপাবলিকান অধিকারকর্মী চার্লি কার্কের হত্যাকারী সম্ভবত একজন রিপাবলিকান হতে পারেন। এমন মন্তব্যের পর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে এবিসি কিমেলকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। তবে তীব্র প্রতিবাদের মুখে এক সপ্তাহের মধ্যেই কিমেলকে স্বপদে ফিরিয়ে আনে এবিসি।
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া
গতকাল হোয়াইট হাউস থেকে কিমেলের কঠোর সমালোচনা করা হয়। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, গুলির ঘটনার মাত্র দুই দিন আগে এবিসির লেট নাইট শোর উপস্থাপক জিমি কিমেল অত্যন্ত ঘৃণ্যভাবে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে ‘হবু বিধবা’ হিসেবে অভিহিত করেন। সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষ কি বলতে পারেন, একজন স্ত্রী তাঁর প্রিয় স্বামীর সম্ভাব্য খুনের ঘটনায় আনন্দে দীপ্তিময় হয়ে উঠবেন?
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক
দীর্ঘদিন ধরে বাক্স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন রিপাবলিকানরা। তাঁরা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে চাকরিচ্যুত বা সমাজচ্যুত করার প্রচেষ্টাকে বরাবরই নিন্দা জানিয়েছেন। তবে গত বছরের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে ট্রাম্প ইসরায়েলের সমালোচকদের শাস্তি দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার ব্যক্তিদের দেশ থেকে তাড়ানোর অভিযান শুরু করেছেন তিনি।



