উপমহাদেশের সরকারি অফিসের চিরচেনা ছবি হলো মাথার ওপর ধীর গতিতে ঘুরতে থাকা পাখা, টেবিলে ফাইলের স্তূপ, স্টিলের আলমারি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মকর্তাদের চেয়ারে বিছানো একটি সাদা তোয়ালে। কিন্তু এই সাধারণ সাদা তোয়ালে কতটা শক্তিশালী ও বিতর্কের বিষয় হতে পারে, তা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচিত হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশে বিতর্কের সূত্রপাত
ভারতের উত্তরপ্রদেশের আইনপ্রণেতাদের একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্যের মুখ্য সচিব মনোজ কুমার সিংয়ের একটি জরুরি ভিডিও কনফারেন্সে নির্দেশ দেওয়া হয়, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সংসদ সদস্য ও বিধায়কদের জন্য আমলাদের মতো একই উচ্চতার এবং 'সাদা তোয়ালে শোভিত' চেয়ার নিশ্চিত করতে হবে। লখনৌয়ের সচিবালয়ে প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার তোয়ালে পরিবর্তন করা হয়। কয়েকজন জনপ্রতিনিধি অভিযোগ করেন, কর্মকর্তাদের চেয়ারে সাদা তোয়ালে থাকলেও তাদের চেয়ারে তা ছিল না, যা প্রটোকলের লঙ্ঘন ও অসম্মানজনক।
ব্রিটিশ আমলের উত্তরাধিকার
এই প্রথাকে ঘিরে ভারতের সাবেক আমলা ও রাজনীতিবিদরা দুই ভাগে বিভক্ত। কংগ্রেস নেতা গুরদীপ সিং সপ্পাল একে ব্রিটিশ শাসনামলের অবশিষ্টাংশ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, একসময় রাস্তাঘাট কাঁচা ছিল, গাড়িতে এসি ছিল না, কর্মকর্তারা ঘোড়ায় চড়ে পরিদর্শনে যেতেন। তখন ঘাম মুছতে ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সাদা তোয়ালে অপরিহার্য ছিল। ব্রিটিশরা চলে গেছে, ঘোড়াও বিদায় নিয়েছে, কিন্তু তোয়ালে রয়ে গেছে ক্ষমতার চিহ্ন হিসেবে।
সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ
সাবেক আমলা আশীষ যোশী এই প্রথাকে 'সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ' বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, এসি রুমে বসে চেয়ারে তোয়ালে রাখা বর্তমানে নিরর্থক এবং এটি কেবল পদের বড়াই করার মাধ্যম।
কমলা তোয়ালে: যোগী আদিত্যনাথের ব্যতিক্রম
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তার চেয়ারে সাদা তোয়ালের পরিবর্তে কমলা রঙের তোয়ালে ব্যবহার করেন। উচ্চপদস্থ আমলাতন্ত্রে সাদা তোয়ালের আধিপত্য থাকলেও রাজনৈতিক উচ্চমহলে এই রঙের পরিবর্তন প্রতীকী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্ষমতার ব্যাকরণ: কালি ও টেবিল
শুধু তোয়ালে নয়, টেবিলের আকার ও কালির রঙও আমলাতন্ত্রে ক্ষমতার পরিচয় দেয়। সাবেক মন্ত্রী অরুণ শৌরির স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে জুনিয়র কর্মকর্তাদের লাল ও সবুজ কালি ব্যবহার নিয়ে ১৩ মাস ধরে বিতর্ক চলেছিল, কারণ ওই রঙগুলো কেবল সিনিয়রদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। টেবিলের উচ্চতা নিয়েও প্রটোকলের জটিলতা রয়েছে। গুরদীপ সপ্পাল জানান, তার নিজের অফিসে ছোট টেবিল বসানোর জন্য তাকে লড়াই করতে হয়েছিল।
টাওয়েল লেগেসি
সাবেক আইপিএস কর্মকর্তা যশোবর্ধন ঝা আজাদ এই প্রথাকে 'টাওয়েল লেগেসি' বলে বর্ণনা করেছেন। আশির দশকে যখন এসি ছিল না, তখন তোয়ালে ছিল ত্রাণকর্তা। কিন্তু আজ এটি একটি 'শারীরিক ব্যাকরণ' হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সেবার চেয়ে পদমর্যাদাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
ভারতের সাধারণ নেটিজেনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলছেন—এই ডিজিটাল যুগেও কি এমন ঔপনিবেশিক 'তোয়ালে প্রথা' খুব বেশি প্রয়োজন?



