দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির হাতে বঙ্কিমচন্দ্রের ছবি তুলে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী
পক্ষকাল অতিবাহিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর। এখনো পূর্ণ মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়নি। কিন্তু কালক্ষেপণ না করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির নীতি রূপায়ণে মন দিয়েছেন। স্বাধীনতার পর এই প্রথম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমিতে বিজেপির সরকার গঠিত হয়েছে। অন্য সবার চেয়ে তাঁরা যে আলাদা, সেই পরিচয় প্রতিষ্ঠার তাগিদে শুভেন্দু হাঁটা শুরু করেছেন। কোনো কোনো সিদ্ধান্ত ক্ষোভ ও আলোড়ন সৃষ্টি করলেও তিনি ভ্রুক্ষেপহীন। বিপুল জয়ে গদিয়ান তিনি। কে কী ভাববে, কার কী প্রতিক্রিয়া, সেসব বিবেচনার সময় এখনো আসেনি।
নির্বাচনী ফলাফল ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এ অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন প্রকৃত অর্থে ‘তৃণমূল কংগ্রেস বনাম ভারত রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছিল কি না, এসআইআরের নামে প্রায় ১ কোটি নাম ছাঁটাই ও ২৭ লাখের ভোটাধিকার হরণ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সুপরিকল্পিত ছক ছিল কি না, কিংবা সুপ্রিম কোর্ট কতটা নিরপেক্ষ থেকেছেন—এসব প্রশ্ন এখন অবান্তর। তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে রায় দিয়েছে, এটাই সত্য। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ‘ইস্তফা’ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কিংবা জোর করে হারানোর অভিযোগ নিষ্ফলা হাহাকার। তাঁদের বরং উচিত আত্মবিশ্লেষণে নিবিষ্ট হওয়া। মানুষ কেন পরিবর্তন চাইছিল অনুধাবন করা। ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খোঁজা।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও কৃচ্ছ্রসাধনের ডাক
ঠিক এই সময়েই কৃচ্ছ্রসাধনের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক বছর সোনা কিনো না, অহেতুক গাড়ি হাঁকিয়ে অফিস-কাছারি যেয়ো না, ওয়ার্ক ফ্রম হোম-অনলাইন ক্লাস ফের চালু করো, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবহার বাড়াও, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমাও, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং ও বিদেশযাত্রা ‘নৈব নৈব চ’—ইত্যাদি যা যা তিনি শুনিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট, আগামীর আভাস ফুরফুরে নয়। পেট্রল-ডিজেল-গ্যাসের দাম বেড়েছে। মহার্ঘ হয়েছে দুধ, পাউরুটি, মাছ, মাংস, ডিম, সবজি। রুপির দাম হু হু করে কমছে, ডলার চড়ছে। কোষাগারে চাপ বাড়ছে। ইরান যুদ্ধ না মিটলে, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকলে আরও অপ্রিয় হওয়া ছাড়া সরকারের উপায় থাকবে না।
প্রতিশ্রুতি ও ঋণের ভার
কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজয়-শুভেন্দুরা প্রতিশ্রুতি পালনে সচেষ্ট। অথচ উত্তরাধিকারসূত্রে ঋণের বিশাল গন্ধমাদন তাঁদের ঘাড়ে। কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন করতে গেলে অপ্রিয় হতে হবে। আবার প্রতিশ্রুতি পালিত না হলে গদি রাখা দায়। প্রতিশ্রুতি পালনের অর্থ আরও ঋণের ভারে ন্যুব্জ হওয়া। এটাই সমকালীন ভারতীয় রাজনীতির ভবিতব্য।
তামিলনাড়ুর ঋণের বোঝা
তামিলনাড়ুর ঋণের বোঝা সবচেয়ে বেশি। মুখ্যমন্ত্রী বিজয় বলেছেন, সরকারের ভাঁড়ে মা ভবানী। কোষাগার ঢং ঢং করছে। ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ৭১ হাজার কোটি রুপি! যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মানুষের মন জিতেছেন, যেমন ৬০ বছরের কম বয়সী নারীদের মাসে আড়াই হাজার রুপি, বিনা মূল্যে প্রতি পরিবারে বছর ছয়টা করে রান্নার গ্যাস, মাসে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ফ্রি, গরিবদের মেয়ের বিয়েতে ৮ গ্রাম সোনা ও সিল্কের শাড়ি, সিনিয়র সিটিজেন ও ভিন্নভাবে সক্ষমদের মাসিক তিন হাজার টাকা পেনশন—স্রেফ এগুলো মেটাতে বছরে লাগবে বাড়তি ১ লাখ ২২ হাজার কোটি রুপি!
পশ্চিমবঙ্গের ঋণ পরিস্থিতি
বাম ফ্রন্টের ৩৪ বছরে পশ্চিমবঙ্গের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৯৪ লাখ রুপি। তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছর শাসনের পর তা সোয়া ৮ লাখ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যবাসীর মাথাপিছু ঋণ ৮০ হাজার। এ অবস্থায় জুন থেকে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডারের’ (বিজেপি নাম বদলে করেছে ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’) অনুদান দ্বিগুণ হচ্ছে। দেড় থেকে তিন হাজার রুপি। সেই সঙ্গে বেকার ভাতা, বিনা ভাড়ায় সরকারি বাসে নারীদের ভ্রমণ এবং সরকারি কর্মী ও পেনশনারদের বকেয়া ‘ডিএ’ দিতে বছরে লাগবে অতিরিক্ত দেড় লাখ কোটি রুপি! এর ওপর সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে দাঁড়ালে কোন গৌরী সেন মুশকিল আসান হবেন কারও জানা নেই।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
এ দেশে সবচেয়ে সহজ হলো প্রতিশ্রুতি দেওয়া। লাগামছাড়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটে জেতাও সহজ। সবচেয়ে কঠিন সেই প্রতিশ্রুতি পালন। বছরখানেক আগে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই ‘ডোল’ বা পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি তুলাধোনা করেছিলেন। প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করে বলেছিলেন, এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে অর্থনীতি চৌপাট হয়ে যাবে। দেউলিয়া হতে হবে। ভাবা হয়েছিল, দেরিতে হলেও প্রধানমন্ত্রী ‘ডোলের’ রাজনীতির বিপদ বুঝেছেন। পাইয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসার দৃঢ়তা দেখাচ্ছেন। কিন্তু ভোটে জিততে তিনিও পারলেন না ব্যতিক্রমী হতে।
কৃচ্ছ্রসাধন ও দৃষ্টান্তের অভাব
এবার কি পারবেন কৃচ্ছ্রসাধনের রাস্তায় হাঁটতে সবাইকে বাধ্য করতে? আহ্বান জানানোর পরের দিনেই ঘোষিত হয় প্রধানমন্ত্রীর পঞ্চদেশীয় সফরসূচি। পরিস্থিতির বিচারে সেই ঘোষণা ছিল ‘ব্যাড টাইমিং’। এক নির্মম পরিহাস। আরও দৃষ্টিকটু ছিল গণমাধ্যমে প্রচারিত এক ভিডিও ক্লিপিং। দিল্লির রাজপথে দুটি কালো গাড়ি চলছে। ভয়েসওভারে শোনা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর গাড়িবহরের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন! ক্লিপিংটি হাস্যকর। কারণ, সবাই জানে, পাইলট কার, অ্যাম্বুলেন্স, জ্যামার, প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী একই মডেলের একই রঙের দুটি গাড়ি (যাতে বোঝা না যায় তিনি কোনটিতে) এবং নিরাপত্তারক্ষী বহনকারী অন্তত একটি গাড়ি, কম করে ছয়টি গাড়ি ছাড়া প্রধানমন্ত্রী রাস্তায় বেরোতেই পারেন না!
কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান ও দৃষ্টান্ত স্থাপন এক নয়। ‘ডোল’ বা পাইয়ে দেওয়ার জনপ্রিয় রাজনীতি ও কৃচ্ছ্রসাধন একসঙ্গে চলতেও পারে না। নেতারা সাইকেল চালাচ্ছেন, বাস-মেট্রোয় চলাফেরা করছেন—খরচ কমানোর এমন ছবি খুব ছাপা হচ্ছে। স্রেফ ছবি তোলার জন্য প্রতীকী না করে নেতারা কৃচ্ছ্রসাধনে আন্তরিক হলে সমাজ অবশ্যই অনুপ্রাণিত হয়। খদ্দর এভাবেই এ দেশে আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল।



