ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা শুরু, সাত বিষয়ে কেন্দ্রীভূত
ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা, সাত বিষয়ে কেন্দ্রীভূত

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে শুরু হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা। টানা ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর চরম সংশয় ও অবিশ্বাসের মাঝেই এই সরাসরি বৈঠকের সূচনা ঘটেছে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই চিরবৈরী রাষ্ট্রের প্রথম শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

বৈঠকের প্রাথমিক পর্ব ও অংশগ্রহণকারীগণ

শনিবার সকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠকের পর সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো এক টেবিলে বসেন দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। মার্কিন পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার উপস্থিত ছিলেন। ইরানের পক্ষে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অংশ নেন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এই আলোচনা সেরেনা হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানও উপস্থিত ছিলেন।

ইরানি প্রতিনিধিদলের প্রতীকী উপস্থাপনা

মার্কিন হামলার ভয়াবহতা তুলে ধরার জন্য ইরানি প্রতিনিধিরা কালো পোশাক পরিধান করে ইসলামাবাদে আসেন। তারা সদ্য নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও যুদ্ধে নিহত অন্যান্য ইরানিদের স্মরণে এই পোশাক পরেছিলেন। এছাড়া তারা মার্কিন হামলায় নিহত স্কুল শিক্ষার্থীদের জুতা ও ব্যাগ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন, যা যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতীক হিসেবে কাজ করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলোচনার সাতটি মূল বিষয়

এই উচ্চমাত্রার বৈঠকে মূলত সাতটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, যা দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্যের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  1. লেবাননে যুদ্ধবিরতি: ইরান লেবাননে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি চায়, যেখানে মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর প্রায় ২,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দাবি করছে লেবাননে ইসরাইলি অভিযান মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতির অংশ নয়, কিন্তু তেহরান একে চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে।
  2. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের আটকে থাকা সম্পদ ছাড় করুক এবং অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুক। ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে রাজি, তবে এর বিনিময়ে ইরানকে তাদের পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচিতে ছাড় দিতে হবে।
  3. হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ: ইরান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম ধমনি হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চায়। তারা এ পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট ফি আদায় ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় কোনো টোল বা সীমাবদ্ধতা ছাড়াই প্রণালিটি পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকুক।
  4. ক্ষতিপূরণ দাবি: ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে হওয়া সব ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইরান ক্ষতিপূরণ চেয়েছে, যা আলোচনার একটি সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
  5. পারমাণবিক কর্মসূচি: ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চায়, কিন্তু ওয়াশিংটন এটি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র আপস করা হবে না।
  6. মিসাইল সক্ষমতা: ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই চায় ইরানের মিসাইল সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা হোক। কিন্তু তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের শক্তিশালী মিসাইল ভান্ডারের বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে তারা রাজি নয়।
  7. মার্কিন সেনা প্রত্যাহার: ইরান চায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন যুদ্ধকামী বাহিনী প্রত্যাহার করা হোক, সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ হোক এবং ভবিষ্যতে আর কোনো আগ্রাসন না চালানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হোক। ট্রাম্প শান্তিচুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছেন।

আটকে থাকা সম্পদ ও লেবানন ইস্যু

ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে যে সরাসরি আলোচনা শুরুর আগেই কাতারসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ছাড় করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে। ইরান এটিকে আলোচনার প্রতি ওয়াশিংটনের 'আন্তরিকতা' হিসেবে দেখছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এই অর্থ মূলত দক্ষিণ কোরিয়ায় ইরানের তেল বিক্রির অর্থ ছিল, যা ২০১৮ সালে প্রথমবার আটকে দেওয়া হয়েছিল।

নিরাপত্তা বেষ্টনী ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট

এই উচ্চমাত্রার আলোচনাকে কেন্দ্র করে ২০ লাখ মানুষের শহর ইসলামাবাদকে নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। শহরের মোড়ে মোড়ে হাজার হাজার সেনাসদস্য ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং মূল কেন্দ্রটিকে রেড জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে দক্ষিণ লেবাননে শনিবারও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত ছিল। বৈরুতের আকাশে ইসরাইলি ড্রোন ও যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা গেছে, অন্যদিকে হিজবুল্লাহ ইসরাইলি অবস্থানে একাধিক পালটা হামলা চালিয়েছে। মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে আলাদা বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও এর আলোচ্যসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে।

পাকিস্তানের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করেছেন যে এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ধাপ হিসেবে কাজ করবে। তিনি দুই পক্ষকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে যে আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং লেবানন ইস্যুতেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে।

শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল যে দুই দেশের প্রতিনিধিরা পরোক্ষভাবে আলোচনায় অংশ নেবেন, কিন্তু পরে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। এই পরিবর্তনকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম সরাসরি আলোচনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে সংঘাতের খাদের কিনারা থেকে ফেরাতে পারবে কিনা তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।