একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কেবল তাহার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্বারা পরিমাপ করা যায় না। সমাজে মানুষ কতটা নিরাপদ, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক কতটা সুস্থ এবং মতভেদ বা বিরোধ কতটা সভ্য উপায়ে নিষ্পত্তি হয়—তাহাও রাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থার সূচক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রতিদিনই অপমৃত্যুর একাধিক ঘটনা আমাদের দেখিতে হইতেছে। গতকাল একই দিনে প্রকাশিত একাধিক অপমৃত্যু, হত্যা, অপহরণ ও সহিংসতার সংবাদ যেন আমাদের সমাজের অন্তর্গত অসুস্থতাকেই প্রকাশ করিতেছে।
বিভিন্ন স্থানে ঘটনার বিবরণ
রাজধানীর মুগদায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এক অতিরিক্ত পরিচালকের গলিত মরদেহ উদ্ধার হইয়াছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো অনুসন্ধানাধীন। একই দিনে জানা গেল, আদাবর-শ্যামলী এলাকায় সক্রিয় এক অপহরণ ও ছিনতাই চক্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে অপহরণ করিয়া মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করিয়াছিল। পাবনার পদ্মা নদীর তীর হইতে হাত বাঁধা অবস্থায় এক কিশোরীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হইয়াছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ধর্ষণের পর তাহাকে হত্যা করা হইতে পারে। মানিকগঞ্জে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধে এক ব্যক্তি নিজের ভাবি ও দেড় বছরের ভাতিজাকে হাতুড়ি দিয়া হত্যা করিয়াছে বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। পটুয়াখালীতে বাড়ির পানি নিষ্কাশনের পাইপ বসানো লইয়া বিরোধের জেরে একজনকে পিটাইয়া হত্যা করা হইয়াছে। কক্সবাজারে পূর্ববিরোধের জেরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে প্রাণ গিয়াছে এক যুবকের। মিরপুরে একাত্তরোর্ধ্ব নূরজাহান বেগমের নিঃসঙ্গ ও করুণ মৃত্যু আবারও বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ববোধের প্রশ্ন তুলিয়াছে। আর ময়মনসিংহে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত বিরোধের প্রেক্ষাপটে এক তরুণ অটোরিকশাচালককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হইয়াছে।
ঘটনার অন্তর্নিহিত কারণ
ঘটনাগুলি পরস্পরের সহিত আপাতভাবে সম্পর্কহীন। কোথাও পারিবারিক বিরোধ, কোথাও রাজনৈতিক উত্তেজনা, কোথাও অপরাধচক্র, কোথাও সামাজিক অবক্ষয়। কিন্তু গভীরভাবে দেখিলে একটি অভিন্ন সূত্র খুঁজিয়া পাওয়া যায়—তাহা হইল—মানুষের সহিষ্ণুতা কমিতেছে, আইন ও নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধা ক্ষয়প্রাপ্ত হইতেছে এবং জীবনের মূল্য ক্রমশ সস্তা হইয়া উঠিতেছে। একসময় গ্রামবাংলায় জমি লইয়া বিরোধ ছিল, পারিবারিক কলহও ছিল। কিন্তু তাহার নিষ্পত্তির জন্য সমাজের প্রবীণেরা, স্থানীয় নেতৃত্ব কিংবা সালিশি ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা পালন করিত। আজ সামান্য বিবাদও অনেক ক্ষেত্রে রক্তপাতের মাধ্যমে শেষ হইতেছে। পানি নিষ্কাশনের পাইপ বসানো, ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করিয়া বাবিতণ্ডা, কিংবা কথা কাটাকাটি—এমন তুচ্ছ কারণেও মানুষ প্রাণ হারাইতেছে। ইহা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নহে—ইহা সামাজিক চরিত্রের অবক্ষয়ের লক্ষণ।
অপরাধের পেশাদারিকরণ ও পারিবারিক দুর্বলতা
আরো একটি উদ্বেগজনক দিক হইল—অপরাধের পেশাদারিকরণ। অপহরণ-ছিনতাই চক্রের ঘটনাটি দেখাইতেছে যে, কিছু মানুষ অপরাধকেই জীবিকার মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করিতেছে। শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী বা একাকী পথচারী—যে কেহই তাহাদের শিকার হইতে পারে। প্রযুক্তি, মোবাইল ব্যাংকিং ও নগরজীবনের দুর্বলতাকে ব্যবহার করিয়া নতুন ধরনের অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠিতেছে। অপরদিকে, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিও যেন দুর্বল হইয়া পড়িতেছে। বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের মনে করাইয়া দেয় যে, কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্বারা মানবিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না।
সামাজিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
অতএব, এই অপমৃত্যুগুলিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলিয়া দেখিলে ভুল হইবে। ইহারা আমাদের সমাজের অন্তর্গত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা অবশ্যই প্রয়োজন—কিন্তু তাহার চাইতেও বেশি প্রয়োজন পরিবারে মূল্যবোধের চর্চা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ, সামাজিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীলতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিশীলন। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কেবল তাহার অস্ত্র, বাজেট কিংবা ভবন নয়—রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তাহার মানুষের চরিত্র এবং নিরাপত্তায়। আর যখন একই দিনে এতগুলি ভিন্ন ঘটনায় আমরা মৃত্যু, সহিংসতা ও নৃশংসতার সংবাদ পড়ি, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি কেবল অপরাধ বৃদ্ধির সাক্ষী, নাকি আরো গভীর কোনো সামাজিক রোগের লক্ষণ দেখিতেছি? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে তাহা সমাজ গবেষকদের নিবিড়ভাবে নিরীক্ষা করিয়া দেখিতে হইবে। তদনুযায়ী রাষ্ট্রব্যবস্থা লইতে হইবে। অন্যথায় অপমৃত্যুর এই মিছিল আরো দীর্ঘ হইতেই থাকিবে।



