মোজতবা খামেনি, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু: যুদ্ধবিরতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব
মোজতবা খামেনি, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু: যুদ্ধবিরতি ও জ্বালানি সংকট

মোজতবা খামেনি, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু: যুদ্ধবিরতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব

আমেরিকা, ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্ততায় আমেরিকা ও ইরানের শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির খবর বিশ্ববাসী জেনেছে। তবে ইসরায়েল এ যুদ্ধবিরতির পক্ষ নয় বলে জানা যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরায়েল ইরানে ও লেবালনে হামলা অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে ইরানও ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে। হরমুজ প্রণালি বর্তমানে কেবল 'আংশিকভাবে' সচল রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান, কারণ ট্রাম্প ইরানের চারপাশে স্থল সেনা মোতায়েনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। কার্যকর যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনাস্থা, সংশয় ও অবিশ্বাস কাটছে না, এবং কিছু যুদ্ধের প্রভাব থেমে নেই।

যুদ্ধের প্রভাব ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট

ইরান যুদ্ধ এক ভয়াবহ বাস্তবতা তৈরি করেছে, যার কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকটে বৈশ্বিক জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। জ্বালানিসংকটের কারণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ধুঁকছে, এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এমন অবস্থা চলতে থাকলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে পৃথিবীর অনেক দেশ তীব্র তেলসংকট পড়বে, এমনকি তেলশূন্যও হয়ে পড়তে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাও রয়েছে সেই কাতারে। সংকট মোকাবিলায় সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে, তবে সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হবে না, কারণ খাদ্য-সেবা উৎপাদন, বাণিজ্য, পরিবহনসহ জনজীবনের সব ক্ষেত্র জ্বালানি ইস্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত।

বৈশ্বিক রাজনীতি ও ট্রাম্পের ভূমিকা

এ সংকটের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানিব্যবস্থার ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। তথ্য দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি তেল রিজার্ভ রয়েছে ভেনেজুয়েলার, এবং হয়তো ভেনেজুয়েলার জ্বালানি সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য ট্রাম্প দেশটির প্রেসিডেন্টকে তুলে আনলেন। অন্যদিকে তেল উত্তোলনে বৈশ্বিক চার্টে ইরানের অবস্থান ষষ্ঠ, এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং পরাশক্তি, বিশেষত চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ট্রাম্পের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র যে পথে হাঁটছে, তা চলতে থাকলে পৃথিবী আরও অশান্ত হয়ে পড়বে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা ও ট্রাম্পের চরিত্র

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ ভিন্নমাত্রা নিয়ে হাজির হয়েছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের জন্য ক্ষান্ত দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা, এমনকি জাতিসংঘকেও উপেক্ষা করে চলেছে। ট্রাম্প নামের এ শাসককে দেখা হচ্ছে উত্তরসত্য দুনিয়ার মূল চরিত্র হিসেবে, যেখানে সত্যের চেয়ে অসত্যের জোগান বেশি। তিনি ফ্যাক্টের তুলনায় ফিকশনে বেশি আসক্ত, এবং জনমনস্তত্ত্বের ওপর তাঁর রয়েছে বিশেষ প্রভাব। জার্নালিজম ইন দ্য পোস্ট–ট্রুথ এরা: এথিক্যাল, পলিটিক্যাল অ্যান্ড সোশ্যাল পারস্পেকটিভ (২০২৫) গ্রন্থে এরিন একিন আরকেন উল্লেখ করেছেন ‘ট্রাম্প কোনো ভয় বা অসত্য কথার প্রভাব বিবেচনা ছাড়াই নিঃসংকোচে মিথ্যা বলেন।’ একই গ্রন্থে ওয়াশিংটন পোস্ট–এর ফ্যাক্ট চেকের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, আগের শাসনামলের চার বছরে ট্রাম্প মোট ৩০ হাজার ৫৭৩টি মিথ্যা বলেছেন। ট্রাম্প ও তাঁর রাজনৈতিক নেক্সাস যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গড়তে বড় বাধা।

সংকট উত্তরণের উপায় ও নাগরিক ভূমিকা

তাহলে চলমান সংকট উত্তরণের উপায় কী? কারণ, বৈশ্বিক চেক অ্যান্ড ব্যালান্সব্যবস্থা কাজ করছে না। এ অবস্থায় শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও মানবিক পৃথিবীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক মানবিক, বোধসম্পন্ন, চিন্তাশীল একাডেমিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, মানবাধিকারকর্মী, অ্যাকটিভিস্ট রয়েছেন, এবং রয়েছে শক্তিশালী গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ। প্রেসার গ্রুপ হিসেবে তাদের ভূমিকা আগামীর পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ পারেন বেপরোয়া শাসককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, কারণ বিষয়টি দেশটির গৌরবগাথার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সব ভালো অর্জন মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছেন এবং দেশটিকে বিশ্ববাসীর সামনে হেয় করে উপস্থাপন করছেন।

যুদ্ধের স্থানীয় প্রভাব ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি

যুদ্ধের কারণে গরিব মানুষ বা গরিব দেশগুলো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ডিজেলের অভাবে হাতিয়ার জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না, এবং রাজধানীতে যাঁরা পাঠাও চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁরাও পড়েছেন মহাসংকটে। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। একদিকে যেমন জ্বালানি তেলের সরবরাহ কম, অন্যদিকে ক্রেতারা আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। ময়মনসিংহের এক পেট্রলপাম্পের মালিকের বক্তব্য থেকে জানা গেছে, সংকটের আগে তিনি প্রতিদিন ৫-৬ হাজার লিটার পেট্রল বিক্রি করতেন, এখন তাঁর পাম্পে প্রতিদিন চাহিদা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার লিটার। আরও রয়েছে অসাধু চক্রের জ্বালানি তেল চুরি ও মজুত করার প্রবণতা, এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অবৈধভাবে মজুত তেল উদ্ধারের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শান্তির আহ্বান

বাস্তবতা হলো, মানুষ মেরে শেষ করা যাচ্ছে না, এবং কোনো যুদ্ধে মানুষ মেরে শেষ করা যায়নি। মানুষ বা মনুষ্যত্ব নিঃশেষ করা যায় না, মৃত্যু মাড়িয়ে মানুষ আবার জীবন ও স্বপ্ন ছিনিয়ে আনে। মানুষ অজেয়, মানুষের মৃত্যু নেই, গাজা, ফিলিস্তিন, ইরান, কাশ্মীরসহ পৃথিবীর অগ্নিগর্ভা কোনো স্থানই মানুষ নিশ্চিহ্ন করা যাচ্ছে না, তবে বাড়ছে কবরের সংখ্যা ও পরিধি। আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মানুষের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা, এটি মানুষের রুহানিয়াত বা আধ্যাত্মিকতা এবং অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। শান্তি না সংঘাত, কোনো পথে হাঁটবে পৃথিবী, দুনিয়াজুড়ে সেই সমর্থন যাচাই করলে নিশ্চয়ই জিতবে শান্তি। শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বাসযোগ্য পৃথিবীর দাবি উঠুক সবার কণ্ঠে, দুই সপ্তাহ নয় চাই বিশ্বব্যাপী স্থায়ী শান্তির বন্দোবস্ত।