আফগান মায়ের কান্নায় ফুটে উঠেছে পাকিস্তানি হামলার নির্মমতা
নিজের মোবাইল ফোনে ছেলের খাবার খাওয়ার একটি ভিডিও বারবার দেখছেন সামিরা মোহাম্মদি। হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি এই ভিডিওটি রেকর্ড করেছিলেন। এখন সেই ভিডিওই হয়ে উঠেছে তাঁর একমাত্র স্মৃতি। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে গত মাসে পাকিস্তানের বিমান হামলায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে সামিরার ২০ বছর বয়সী ছেলে আরেফ খানও রয়েছেন।
হাসপাতালে হামলায় নিহতদের তালিকায় মাদকাসক্তি চিকিৎসাকেন্দ্রের রোগীরা
আফগান কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১৬ মার্চ পাকিস্তানের ছোড়া একটি বোমা কাবুলের 'ক্যাম্প ওমিদ' নামক মাদকাসক্তি চিকিৎসাকেন্দ্রে আঘাত হানে। প্রাথমিকভাবে ৪১১ জন নিহতের খবর পাওয়া গেলেও জাতিসংঘের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছে যে অন্তত ২৫০ জন নিহত হয়েছেন। এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
৪৩ বছর বয়সী সামিরা মোহাম্মদি তাঁর ভাঙাচোরা বাড়িতে বসে বলেন, 'এই বিষয়ে অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। আমার মতো অনেক মা তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন, অনেক নারী স্বামী হারিয়েছেন এবং অনেক বোন ভাই হারিয়েছেন।' তাঁর চোখে অশ্রু আর কণ্ঠে বেদনা মিশে আছে।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলা
কয়েক মাস ধরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, সীমান্তের ওপার থেকে এসে পাকিস্তানে হামলা চালানো জঙ্গিদের কাবুল আশ্রয় দিচ্ছে। তালেবান সরকার এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। পাকিস্তানের দাবি, তারা একটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, কিন্তু কাবুলে বেসামরিক হাসপাতালে হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সাংবাদিকেরা বেশ কয়েকটি মৃতদেহ দেখেছেন, যাদের মধ্যে অনেকের দেহ ছিন্নভিন্ন বা দগ্ধ অবস্থায় ছিল। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে কিছু মৃতদেহ শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
মাদকাসক্তি থেকে মুক্তির চেষ্টায় ছিলেন সামিরার ছেলে
সামিরার ছেলে আরেফ খান ইরানে একটি কসাইখানায় কাজ করার সময় মেথামফেটামিন নামক মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। সহকর্মীদের প্ররোচনায় তিনি এই মাদক সেবন শুরু করেছিলেন, যাতে বেশি সময় জেগে কাজ করতে পারেন। কয়েক মাস আগে পরিবারটি আফগানিস্তানে ফিরে আসে এবং কাবুলে নতুন জীবন শুরু করার চেষ্টা করে।
আরেফ দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন, আর তাঁর মা সামিরা গৃহকর্মীর কাজ করতেন। মাদকের নেশা থেকে মুক্তির জন্য আফগান কর্তৃপক্ষ আরেফকে 'ক্যাম্প ওমিদ' পুনর্বাসনকেন্দ্রে ভর্তি করায়। হামলার দিন সামিরা ছেলের জন্য কিছু জিনিসপত্র নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন।
'আমি তার সঙ্গে বসেছিলাম, তার একটি ভিডিও রেকর্ড করেছিলাম এবং সে তার খাবার খেয়েছিল,' স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সামিরার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। 'সাধারণত যখন কোনো যুদ্ধ হয়, সামরিক ক্ষেত্র লক্ষ্যবস্তু হয়। তাহলে কেন তারা এই হাসপাতালে হামলা করল?'
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা ও তদন্তের আহ্বান
ওয়ার চাইল্ড ইউকেসহ ১৭টি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার একটি স্বতন্ত্র তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, যারা এই হামলার জন্য দায়ী, তাদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তালেবান সরকার দাবি করেছে যে তারা গণমাধ্যম, কূটনীতিক ও বেসরকারি সংস্থাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছে এবং প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। আফগানিস্তান বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক রিচার্ড বেনেটের মতে, 'যাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, প্রাথমিকভাবে তাদের ওপরই দায়ভার বর্তায়, আর তারা হলো পাকিস্তান।'
ন্যায়বিচারের পথে বাধা ও আশার আলো
যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক কেনেথ রথ বলেছেন, অনেক নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর পর পাকিস্তান কোথায় ভুল করেছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে বলে তিনি আশা করছেন। আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশন (ইউএনএএমএ) সংঘাতের প্রভাব নিয়ে তদন্ত করে থাকে, এবং বোমাবর্ষণের প্রভাব নিয়েও তদন্ত করা হবে।
যদি তদন্তে 'নাগরিকদের ওপর ইচ্ছাকৃত বা বেপরোয়া আক্রমণের' প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে এই হামলার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিযোগ উঠতে পারে। যদিও ইউএনএএমএ–এর বিচার করার কোনো ক্ষমতা নেই, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) আফগানিস্তানে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে পারেন।
রথ আরও উল্লেখ করেছেন যে গাজা, ইউক্রেন, সুদান বা মিয়ানমারে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর ওপর হামলার দায়ে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে কেউ দোষী সাব্যস্ত হয়নি। মামলা না হওয়া এ ধরনের যুদ্ধাপরাধকে উৎসাহ দেয় বলেও তিনি মনে করেন।
শোকাহত মায়ের অটুট আশা
তবে কঠিন সংগ্রামে জীবন চালিয়ে নেওয়া সামিরা এখনো আশা ছাড়েননি। তিনি ছেলে হত্যার ন্যায়বিচার পেতে চান। তাঁর দাবি, '২০ বছরের একটি ছেলে, যাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, তাকে কেন হত্যা করা হলো, পুড়িয়ে ফেলা হলো? এর তদন্ত করতে হবে।'
'যদি আমরা এখনই এর কারণ জানতে না চাই, তবে হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের একই ক্ষতি আবার দেখতে হবে,' বলেন এই শোকাহত মা, যার জীবন এখন শুধুই একটি মোবাইল ভিডিও এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়।



