মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি, ইরানের অনড় অবস্থান
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং জ্বালানি পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি চালু করার লক্ষ্যে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে একটি দ্বি-ধাপী পরিকল্পনা পাঠিয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাবকে 'যথেষ্ট ভালো নয়' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, মার্কিন বাহিনী চাইলে মাত্র এক রাতেই পুরো ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতই সেই রাত হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পাকিস্তানের পরিকল্পনা ও ইরানের প্রতিক্রিয়া
পাকিস্তানের পাঠানো পরিকল্পনায় দুটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি শুরু হবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, যাকে 'ইসলামাবাদ চুক্তি' বলা হচ্ছে। গত রোববার রাতে এই পরিকল্পনা দুই পক্ষের কাছে পাঠানো হয়। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাতভর যোগাযোগ করেন বলে জানা গেছে।
তবে ইরান এই প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধের পুরোপুরি সমাপ্তি চায়। হরমুজ প্রণালি খোলা নিয়েও ইরান আপত্তি জানিয়ে বলেছে, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে প্রণালিটি খুলবে না এবং চুক্তির জন্য কোনো সময়সীমাও মানবে না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগেরি উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধ যেন আবার নতুন করে শুরু না হয়, তা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকি ও যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি
ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত আটটায় শেষ হচ্ছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, চুক্তি না হলে এবং হরমুজ প্রণালি না খুলে দিলে ইরানে 'নরক নেমে আসবে'। দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলা চালানো হবে বলে তিনি হুমকি দেন। গতকাল হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প পাকিস্তানের প্রস্তাবকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে স্বীকার করলেও তা যথেষ্ট ভালো নয় বলে মন্তব্য করেন।
এদিকে, যুদ্ধের ৩৮তম দিনে গতকাল ব্যাপক পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। ইরানের হামলায় উত্তর ইসরায়েলের হাইফা শহরে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং চারজন নিহত হন। তেল আবিবসহ মধ্য ইসরায়েলের অন্তত ২৮টি স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। লেবানন, সৌদি আরব, বাহরাইন ও ইরাকের হামলার খবরও পাওয়া গেছে। ইরানের দিকে থেকে তেহরানের শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং আসালুয়েহ এলাকায় পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় হামলা চালানো হয়। এদিন হামলায় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দাপ্রধান সায়েদ মাজিদ খাদেমিও নিহত হন।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও মানবিক সংকট
এই যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। গতকাল প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ১১০ ডলার। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএনএ জানিয়েছে। এক ইরানি তরুণ বিবিসিকে বলেন, 'মনে হচ্ছে আমরা চোরাবালিতে আটকে যাচ্ছি। আমরা সাধারণ মানুষ কিই-বা আর করতে পারি? ট্রাম্পকে তো থামাতে পারব না।'
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সোমবার ইরানে সবচেয়ে বেশি হামলা চালানো হবে এবং মঙ্গলবার আরও বেশি হামলা হবে। যদিও এমন হুমকি তিনি আগেও দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হলেও যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা এখনও অচলাবস্থায় রয়েছে।



