ইরান যুদ্ধের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ: ট্রাম্পের মিশ্র বার্তা ও তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট
তেহরানের উত্তর–পূর্বের আকদাসিয়েহ তেল ডিপোতে রোববার হামলার পর রাতভর আগুন জ্বলতে ও ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। এই ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান যুদ্ধ সময়ে সময়ে নতুন মোড় নিচ্ছে, যা সরকার, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষদের জন্য ক্রমশ অনিশ্চিত করে তুলছে। এখন অনেক কিছুই নির্ভর করছে সেসব নেতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর, যাঁরা অনেক বেশি অনিশ্চিত আচরণ করেন।
ট্রাম্পের মিশ্র বার্তা ও নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা
এই নেতাদের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি রয়েছেন। গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধকে ‘স্বল্পকালীন অভিযান’ বলে উল্লেখ করেছেন, যা ‘শিগগিরই’ শেষ হতে পারে। তবে তিনি এও বলেছেন, ইরান যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা অন্য কোনো মিত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ‘দীর্ঘ সময়ের’ জন্য না হারাবে, ততক্ষণ এই যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত হবে না।
অন্যদিকে, মোজতবা খামেনি সম্পর্কে এখনো তেমন কিছু জানা যায়নি এবং তিনি পরীক্ষিত নেতাও নন। এই অনিশ্চয়তা যুদ্ধের গতিপথকে আরও জটিল করে তুলছে।
তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট: বিশ্লেষণ ও প্রভাব
হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য সমাপ্তির তিনটি দৃশ্যপট তৈরি করেছেন—সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি, সেরা সম্ভাবনা এবং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি। সরকারি তথ্য ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:
১. সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট (৬০%): ইরানকে কোণঠাসা করা
এই দৃশ্যপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেনাবাহিনীকে ইরানের শক্তি প্রদর্শন বা প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা দুর্বল করার মিশন সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সময় দেবেন। এর মানে দাঁড়ায়, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কাগুলো যথেষ্ট পরিমাণে সামলে রাখতে পারবে এবং প্রেসিডেন্ট তাঁর নির্দেশিত মিশনের প্রতি অটল থাকবেন।
এমন পরিস্থিতিতে ধরে নেওয়া হচ্ছে, এ মাসের শেষ নাগাদ ইরানের শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো অক্ষত থাকবে। তীব্র সামরিক অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ অভিযান তার নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করেছে। কিন্তু তেহরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তনের নিশ্চয়তা থাকবে না।
এরপর দেশটির নতুন সরকার যতক্ষণ না এবং যদি না তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করতে সম্মত হয় না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বহাল থাকবে। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সম্ভাব্য অন্যান্য অংশীদারদের সামরিক উড়োজাহাজ সীমিত ঝুঁকি নিয়ে ইরানের আকাশে টহল দেবে।
২. সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি (৩০%): এখনকার চেয়ে আরও শক্তিশালী ইরান
এই দৃশ্যপটটি হতে পারে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে গিয়ে যদি সামরিক বাহিনী তাদের কাজ পুরোপুরি শেষ করার আগেভাগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে জয় ঘোষণা করতে বাধ্য হন। এমন পরিস্থিতিতে ইরান আবার নিজের শক্তি কাঠামো পুনর্গঠন করবে—আঘাতে জর্জরিত হয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং পুনরায় সবকিছু শুরু করার মতো যথেষ্ট সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকবে।
এতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আরও কমে যাবে। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলো সবসময় এমন এক ইরানের হামলার হুমকির মুখে থাকবে, যার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে পারে এবং ব্যবসা করার খরচ দ্রুত বেড়ে যাবে।
৩. সেরা সম্ভাবনা: নতুন ইরান ও নতুন মধ্যপ্রাচ্য (১০%)
এই দৃশ্যপট হতে পারে ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রেখে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোয় আঘাত হানা, সরকারকে দুর্বল করে দেওয়া, দেশটির বিরোধীদের মনোবল বাড়ানো যাতে তারা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভের মাধ্যমে বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের দাবি তোলে। তবে ইতিহাসে দেখা গেছে, বাইরে থেকে সামরিক চাপে কোনো দেশের শাসন ব্যবস্থার দ্রুত পতন সম্ভব হয় না, যদি না অভ্যন্তরীণভাবে বিরোধীদের সংগঠিত ও সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে না ওঠে।
সম্ভাব্য দৃশ্যপটগুলোর সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
এই দৃশ্যপটে তিনটি সম্ভাবনার একটিকে অন্যটির বিরোধী মনে করা হচ্ছে না। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের নামমাত্র প্রধান হয়ে থাকতে পারেন। তিনি ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে নিজের হাতে তুলে নিতে পারবেন কি না তা বোঝা যাচ্ছে না কিংবা তিনি নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য সুযোগও সৃষ্টি করতে পারেন।
দীর্ঘ মেয়াদে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, এবং ইরানি জনগণই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করবে। শেষ পর্যন্ত এই শাসনব্যবস্থা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারে। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, সেটা ইরান যুদ্ধ নিয়ে যে কোনো পূর্বাভাসেই বলা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন এই অর্থনৈতিক ধাক্কার মাঝেও নিজের সামরিক অভিযান শেষ করার দৃঢ় সংকল্প দেখাচ্ছে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ ইঙ্গিতও দিয়েছেন, যে কোনো মুহূর্তে বিপরীত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
যদি সত্যিই মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের কাজ শেষ করার আগেই কৌশল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্যকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। এই যুদ্ধ শুরু করার যে যুক্তিই থাকুক না কেন, অভিযান তাড়াহুড়ো করে শেষ করলে তা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে আরও সাহসী করে তুলতে পারে এবং ওই অঞ্চল ও বিশ্ব ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।
