ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করতে সোমালিয়ার বিচ্ছিন্ন অঞ্চল সোমালিল্যান্ডে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে ইসরাইল। গত ডিসেম্বরে প্রথম দেশ হিসেবে ইসরাইল সোমালিল্যান্ডকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছে। বুধবার (১১ মার্চ) ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রাথমিক পদক্ষেপ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সোমালিল্যান্ডের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোমালিল্যান্ড ইসরাইলকে হুথিদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সামরিক অভিযান পরিচালনার অনুমতি দেবে। ইতোমধ্যেই ইসরাইল এই অঞ্চলে একটি সম্ভাব্য ঘাঁটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। গত জুন মাসে ইসরাইলি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি দল সোমালিল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
সেখানে তারা আনসারুল্লাহ নামে পরিচিত হুথি আন্দোলনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একটি উপযুক্ত ঘাঁটি বা স্থাপনার সন্ধানে সৈকতগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। এই সম্ভাব্য স্থানটি এডেন উপসাগর হয়ে ইয়েমেন থেকে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এছাড়া হারগেইসা শহরে একটি হোটেলের শীর্ষ তলায় বিস্ফোরণরোধী জানলাযুক্ত কক্ষ ভাড়া নিয়েছে ইসরাইল, যা তাদের দূতাবাস স্থাপনের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের মন্ত্রীর বক্তব্য
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের মন্ত্রী খাদার হোসেন আবদি বলেন, ‘নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের একটি কৌশলগত সম্পর্ক থাকবে যা অনেক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এটি একটি সামরিক ঘাঁটি হবে কিনা তা নিয়ে আমরা এখনো আলোচনা করিনি, তবে ভবিষ্যতে অবশ্যই এ নিয়ে বিশ্লেষণ করা হবে।’
ইসরাইলের জন্য হুথিদের হুমকি
ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হুথি আন্দোলন গত এক সপ্তাহ আগে ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পর থেকে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি। ইরান এই যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে ইসরাইলসহ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়েছে। গাজা যুদ্ধের সময় হুথিরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ এবং ইসরাইলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল।
একজন ইসরাইলি জেনারেল জানিয়েছেন, হুথিদের মোকাবিলায় একটি বিশেষ গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করা হয়েছে, কারণ তাদের কাছে কয়েকশ রকেট রয়েছে যা ইসরাইলে আঘাত হানতে সক্ষম। দীর্ঘ বছর আলোচনার পর গত ডিসেম্বরে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়, কারণ ইসরাইলি গোয়েন্দারা হুথিদের তাদের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন।
লোহিত সাগরে হামলার ফলে এডেন উপসাগর দিয়ে সমুদ্র চলাচল গত দুই বছরে ৭০ শতাংশ কমে গেছে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
সোমালিল্যান্ডের ঐতিহাসিক পটভূমি
১৯৬০ সাল থেকে সোমালিল্যান্ড একীভূত সোমালি প্রজাতন্ত্রের অংশ ছিল, কিন্তু ১৯৯১ সালে তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের দাবি করে। জাতিসংঘভুক্ত কোনো স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র তাদের স্বীকৃতি না দিলেও গত ডিসেম্বরে ইসরাইল প্রথম তাদের স্বীকৃতি দেয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক
ইসরাইলি ঘাঁটির জন্য সম্ভাব্য স্থানগুলোর মধ্যে একটি হলো বন্দর নগরী বারবেরা থেকে ১০০ কিলোমিটার পশ্চিমে একটি উঁচু এলাকা। এই বারবেরা শহরেই সোমালিল্যান্ডের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি সামরিক বিমানঘাঁটি এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিচালিত একটি বন্দর রয়েছে।
২০১৭ সালে সোমালিল্যান্ড সরকার বারবেরায় একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য আমিরাতের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, বারবেরার নৌঘাঁটিটি একটি আধুনিক সামরিক বন্দর, গভীর সমুদ্রের ডক এবং হ্যাঙ্গারসহ একটি রানওয়েতে রূপান্তরিত হয়েছে। এখানকার রানওয়েটি ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা ভারী পরিবহন বিমান এবং যুদ্ধবিমান ওঠানামার জন্য উপযোগী।
গত জানুয়ারিতে সোমালিয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, তবে সোমালিল্যান্ড ও পান্টল্যান্ড প্রশাসন সোমালিয়ার সেই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই জটিল আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের সামরিক উপস্থিতি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
