মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে হুথিদের নীরবতা: কৌশলগত ধৈর্য নাকি ইরানের অপেক্ষা?
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিধ্বংসী সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। তেহরান থেকে শুরু হওয়া আগুনের লেলিহান শিখা আবুধাবি, দোহা, কুয়েত সিটি, মানামা এবং বৈরুতের মতো শহরগুলোকে গ্রাস করলেও একটি দেশ আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত রয়েছে, সেটি হলো ইয়েমেন। লোহিত সাগরে ত্রাস সৃষ্টিকারী ইরানপন্থি হুথি বিদ্রোহীরা এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কেবল মৌখিক নিন্দা ও বিক্ষোভের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে, যা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
হুথিদের নীরবতার পেছনের কারণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হুতিরা কেন এখনও ‘ট্রিগারে আঙুল’ রেখেও গুলি ছুড়ছে না, তা নিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের এই নীরবতা মূলত তাদের কৌশলগত ধৈর্য এবং গত বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলাফল। গত আগস্টে সানায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় হুথি প্রধানমন্ত্রী আহমেদ আল-রাহাওয়ি ও চিফ অব স্টাফ মোহাম্মদ আল-ঘুমারিসহ ১২ জন উচ্চপদস্থ নেতা নিহত হন। এই বিশাল ক্ষতি হুতি নেতৃত্বকে অনেক বেশি সতর্ক করে তুলেছে, যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে তারা দ্বিগুণ সাবধানতা অবলম্বন করছে।
এসিএলইডি-এর সিনিয়র বিশ্লেষক লুকা নেভোলা বলেন, “হুথিরা সম্ভবত ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার ভয় পাচ্ছে। তাদের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি প্রতিশোধমূলক হামলা এড়ানো।” এই ভয় তাদেরকে একটি অপেক্ষমাণ অবস্থানে রাখছে, যেখানে তারা যুদ্ধের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করছে।
ইরানের তুরুপের তাস হিসেবে হুথি
ইয়েমেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদাম আল-হুরাইবি মনে করেন, হুথিরা যুদ্ধে নামবে কি না তা নির্ভর করছে ইরানের সবুজ সংকেতের ওপর। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “তেহরান তার সব কার্ড একসাথে ব্যবহার করতে চায় না। তারা হুথিদের যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য জমিয়ে রাখছে। ইসরায়েলি-মার্কিন হামলা না থামলে হুথিরা অনির্দিষ্টকাল হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।” হুথি প্রধান আবদেল মালিক আল-হুতি সম্প্রতি এক ভাষণে দাবি করেছেন, ইয়েমেন ইরানের পাশে আছে এবং তাদের হাত ট্রিগারে রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তারা এখনও সক্রিয় হামলা শুরু করেনি।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, হুথিরা যদি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জড়ায়, তবে তারা কেবল ইসরায়েল নয়, বরং সংযুক্ত আরব আমিরাত এমনকি সোমালিল্যান্ডের মতো আঞ্চলিক অংশীদারদেরও লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত ও জটিল করে তুলতে পারে, বিশেষ করে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ইরানের পতনের আশঙ্কা ও হুথিদের ভবিষ্যৎ
ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর একের পর এক হামলা হুথিদের মনোবলে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্লেষক আল-হুরাইবি উল্লেখ করেন, “ইরান হুথিদের জন্য একটি ধর্মীয় আদর্শ। সেই আদর্শ যদি পরাজিত হয়, তবে তাদের মনোবল অটুট থাকা কঠিন।” এছাড়া, ইরান থেকে আসা অস্ত্রের চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেলে হুথিরা সামরিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়বে, যা তাদের যুদ্ধক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করবে।
ইউএন সিকিউরিটি কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতে, রাশিয়া, চীন ও ইরানে তৈরি অস্ত্র বিভিন্ন পথে ইয়েমেনে পাচার করা হয়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে, যা হুথিদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। এই অস্থিরতা ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলছে, যারা যুদ্ধের ভয়ে দৈনন্দিন পণ্য মজুত করছেন।
সানার সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
যুদ্ধ ইয়েমেনের মাটিতে এখনও পৌঁছালেও সানার সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ২৮ বছর বয়সী সানা নিবাসী মোহাম্মদ ইয়াহিয়া জানান, যুদ্ধের খবর পাওয়ার পরপরই তিনি পরিবারকে আটা, চাল ও রান্নার গ্যাস মজুত করতে বলেছেন। তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সানায় বোমা বর্ষণ শুরু হবে। পুরো অঞ্চল যুদ্ধে লিপ্ত, আর আমরা ইয়েমেনিরা কেবল দর্শক হয়ে তাকিয়ে আছি। শেষ পর্যন্ত হুথিরাই সিদ্ধান্ত নেবে ইয়েমেন এই আগুনে পুড়বে কি না।” এই অনিশ্চয়তা ইয়েমেনের জনগণের জন্য একটি মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লোহিত সাগরে হামলার সম্ভাবনা
লোহিত সাগরে ইতোমধ্যে ৪টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া এবং ৯ জন নাবিককে হত্যার রেকর্ড থাকা হুথিরা যদি নতুন করে হামলা শুরু করে, তবে তা ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে, তখন হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে আরও ভয়াবহ রূপ দিতে পারে, যদি হুথিরা তাদের নীরবতা ভঙ্গ করে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে।
সামগ্রিকভাবে, হুথিদের বর্তমান অবস্থান একটি কৌশলগত গণনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ইরানের নির্দেশনা এবং আঞ্চলিক শক্তির গতিবিধির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ অনেকটাই এই অপেক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে, এবং ইয়েমেনের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনশীল হিসেবে রয়ে গেছে।
