ডব্লিউএইচও'র প্রতিবেদন: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলায় ইরানে ১৩ হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত, ৪ স্বাস্থ্যকর্মী নিহত
ইরানে হামলায় ১৩ হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত, ৪ স্বাস্থ্যকর্মী নিহত

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলায় ইরানের স্বাস্থ্যখাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার ফলে ইরানে মোট ১৩টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই হামলাগুলোতে ইতিমধ্যে চারজন স্বাস্থ্যকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও ২৫ জন কর্মী বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয়েছেন। সংস্থাটির পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানও প্রকাশ করেছে।

চলমান সংঘাত ও ব্যাপক প্রাণহানি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ হামলা এখনও সক্রিয়ভাবে চলমান রয়েছে। ইরানের ভূখণ্ডে পরিচালিত এসব আক্রমণে ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার ২৩০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, লেবাননে ইসরায়েলের আলাদা হামলায় আরও শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ইরান পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে ইসরায়েলের ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন সামরিক সদস্যকে হত্যা করেছে। এই চলমান যুদ্ধের কারণে ইরানসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, যা একটি ভয়াবহ মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও স্কুল আক্রমণ

নিহতদের তালিকায় ইরানের অসংখ্য শিশু শিক্ষার্থীও রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। গত রবিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরে অবস্থিত শাজারেহ তায়েবেহ স্কুলে একটি ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। এই হামলায় স্কুলটির অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। ডব্লিউএইচও স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই চলমান সংঘাত পুরো আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সংস্থাটির দুবাইয়ে অবস্থিত বৈশ্বিক জরুরি লজিস্টিকস হাবের সমস্ত কার্যক্রম বর্তমানে নিরাপত্তাজনিত কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে।

ডব্লিউএইচও প্রধান ও আঞ্চলিক পরিচালকের বক্তব্য

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউএইচও'র মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রিয়াসিস সরাসরি বলেন, "আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে ইরানে ১৩টি এবং লেবাননে একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হামলার শিকার হয়েছে।" তবে তিনি কারা এসব স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলেননি। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, "আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা খাতকে অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং এর ওপর কোনও ধরনের আক্রমণ কখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।"

ডব্লিউএইচও'র পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হানান বাল্কি একই সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান, "ইরানে মোট চারটি অ্যাম্বুলেন্স যানবাহন সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা স্থাপনাগুলোর কাছাকাছি অঞ্চলে হামলা হওয়ায় সেগুলোও সামান্য থেকে মাঝারি মাত্রার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।" লেবাননের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, "সেখানে নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থানীয় জনগণকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে বহু হাসপাতাল ও ক্লিনিক সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে।"

হাসপাতাল ফাঁকা করা ও ইরানের দূতের অভিযোগ

এর আগে ডব্লিউএইচও'র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি বড় হাসপাতালের পাশেই একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। এই বিস্ফোরণের কারণে হাসপাতাল ভবনটিকে দ্রুত ফাঁকা করে রোগী ও কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সপ্তাহের শুরুতে জেনেভায় ডব্লিউএইচও প্রধানকে পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিতে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের দূত তীব্র অভিযোগ করেন যে, ইরানের অন্তত ১০টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রকে ইচ্ছাকৃতভাবে সামরিক হামলার লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে।

মানবিক সহায়তা ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব

সংবাদ সম্মেলনে তেদরোস আধানম গেব্রিয়াসিস আরও সতর্ক করে বলেন, "এই সংঘাতের প্রভাব শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই। দুবাইতে অবস্থিত আমাদের লজিস্টিকস হাবের সমস্ত কার্যক্রম বর্তমানে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সম্পূর্ণরূপে স্থগিত রয়েছে।" হানান বাল্কি জানান, গত বছর এই হাবটি বিশ্বের ৭৫টি দেশের জন্য ৫০০টিরও বেশি জরুরি অর্ডার সফলভাবে প্রক্রিয়াজাত করেছিল। কিন্তু বর্তমানে নিরাপত্তা সংকট, আকাশপথ বন্ধ থাকা এবং হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশাধিকারে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে এটি তার নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন, "পুরো মানবিক স্বাস্থ্য সরবরাহ চেইনগুলো এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট ডেকে আনতে পারে।"