ভারত মহাসাগরে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবি: আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি
গত বুধবার ভারত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানের যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস দিনা মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ডুবে যায়। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ঘটনাস্থল থেকে ৮৭টি মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং ৩২ জন ইরানি নাবিককে জীবিত বাঁচিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবমেরিন থেকে টর্পেডো ছুড়ে কোনো যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার এমন ঘটনা বিরল বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।
যুদ্ধজাহাজের পটভূমি ও ভারতীয় সংযোগ
ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ভারতের বিশাখাপত্তম বন্দরে গত ১৫ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ ও বহুজাতিক নৌ মহড়া এমআইএলএএন ২০২৬-এ অংশ নিয়েছিল। ভারতীয় নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে এক্সে প্রকাশিত একটি পোস্টে মহড়া চলাকালীন জাহাজটিকে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, জাহাজটি ভারতীয় নৌবাহিনীর অতিথি হিসেবে দেশটিতে অবস্থান করছিল।
মার্কিন ও ইরানি প্রতিক্রিয়া
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, এ ঘটনা ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান এখন দেশটির সীমান্তের বাইরেও বিস্তৃত হওয়ার প্রমাণ দিচ্ছে। তিনি আইআরআইএস দিনাকে একটি মূল্যবান শিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের নৌবাহিনীকে পুরোপুরি নির্মূল করাই এ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন নৌবাহিনীর এ পদক্ষেপকে সমুদ্রে একটি নৃশংসতা আখ্যা দিয়েছেন এবং এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, এ হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অচিরেই চরম অনুশোচনা করতে হবে। জাহাজটিতে ইরানের প্রায় ১৩০ জন নাবিক ছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
ভারতে আলোচনা ও বিতর্ক
এ ঘটনায় ভারতে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে, বিশেষ করে যেখানে ভারত মহাসাগরে নয়াদিল্লির শক্তিশালী নৌ উপস্থিতি রয়েছে। ভারতের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের নীরবতার তীব্র সমালোচনা করেছে। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এক্সে পোস্ট করে লিখেছেন, ভারত মহাসাগরে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংঘাত আমাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কিছুই বলছেন না।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার জন্য ভারত রাজনৈতিক বা সামরিক—কোনোভাবেই দায়ী নয়। তিনি আরও বলেন, ভারতের কাছে যেসব বিষয় সংবেদনশীল, সেগুলোকে উপেক্ষা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, কারণ ভারতের আমন্ত্রণেই জাহাজটি এ জলসীমায় অবস্থান করছিল।
আন্তর্জাতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এ ঘটনা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পরিধি মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বহু দূরে ছড়িয়ে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারত মহাসাগরকে দীর্ঘকাল ধরে নিজের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে নয়াদিল্লি, এবং বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রধান সমুদ্রপথগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভারতীয় নৌবাহিনী নিয়মিত টহল ও মহড়া পরিচালনা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার ক্ষেত্রে ভারত ঐতিহাসিকভাবেই একটি সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে, যা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
