ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে হেরে যাবে: 'চীনের নস্ট্রাদামাস' অধ্যাপক জিয়াং-এর ভবিষ্যদ্বাণী
দখলদার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে চালানো আগ্রাসনের জবাবে তেহরান এখন ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে। ইসরাইলি ভূখণ্ড এবং উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোই তাদের লক্ষ্যবস্তু। মজার ব্যাপার হলো, ইরান এখন একাই ১০টির বেশি দেশের বিরুদ্ধে বীরদর্পে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ভবিষ্যদ্বাণী করে ভাইরাল অধ্যাপক জিয়াং
চলমান এই সংঘাতে এখনো জয়-পরাজয় স্পষ্ট না হলেও, জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল 'প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি'-র সঞ্চালক অধ্যাপক জুয়েকিন জিয়াং দাবি করছেন, ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে হেরে যাবে। চীনা-কানাডীয় এই শিক্ষাবিদ ২০২৪ সালে একটি অনলাইন বক্তৃতায় এ মন্তব্য করেছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ব্যাপক যুদ্ধ চলমান থাকায় ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
অধ্যাপক জিয়াং ২০২৪ সালে তিনটি বড় ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন:
- ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ক্ষমতায় ফিরবেন
- ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করবেন
- যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে যুদ্ধে হেরে যাবে
তার প্রথম দুটি ভবিষ্যদ্বাণী ইতোমধ্যেই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা তাকে ‘চীনের নস্ট্রাদামাস’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন। নস্ট্রাদামাস ছিলেন ১৬০০ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসি জ্যোতিষী ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টা।
কে এই অধ্যাপক জুয়েকিন জিয়াং?
জুয়েকিন জিয়াং বর্তমানে কেজিয়াং বেইজিংয়ে দর্শন ও ইতিহাস পড়ান। ইয়েল কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা এই শিক্ষক তার কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় চীনে শিক্ষা সংস্কার এবং পাঠ্যক্রম প্রণয়নের কাজে ব্যয় করেছেন। শিক্ষকতার বাইরে, জিয়াং তার ইউটিউব প্রকল্প ‘প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি’-র মাধ্যমে অনলাইনে এক বিশাল অনুসারী গোষ্ঠী তৈরি করেছেন।
তার ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন। এই বক্তৃতাগুলোতে তিনি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিমূলক ধরন, ভূ-রাজনৈতিক চালিকাশক্তি এবং 'গেম থিওরি' বিশ্লেষণের মাধ্যমে বৈশ্বিক ঘটনাবলির পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করেন। তার পদ্ধতিটি লেখক আইজ্যাক আসিমভের 'ফাউন্ডেশন' উপন্যাসে কাল্পনিক বিজ্ঞান ‘সাইকোহিস্ট্রি’ ধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত।
বিতর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীর বিশদ বিবরণ
২০২৪ সালের মে মাসে রেকর্ড করা একটি বহুল আলোচিত লেকচারে জিয়াং যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ট্রাম্প যদি ক্ষমতায় ফিরে আসেন, তবে ভূ-রাজনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, এ ধরনের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা টেনে জিয়াং ইরানের সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণকে 'সিসিলিয়ান এক্সপেডিশন'-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যখন এথেন্স একটি বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করেছিল যা শেষ পর্যন্ত বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল। তিনি যুক্তি দেন যে, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনসংখ্যা দীর্ঘায়িত দখলদারিত্বকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলবে।
জিয়াংয়ের মতে ইরানের সুবিধাগুলো হলো:
- পাহাড়ি ভূখণ্ড যা প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করে
- দীর্ঘ রসদ সরবরাহ লাইন যা মার্কিন বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জিং
- শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা
- ২০ বছর ধরে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি
মার্কিন টিভি শো-তে জিয়াংয়ের সতর্কবার্তা
জিয়াং সম্প্রতি সংবাদ ও মতামত বিষয়ক সিরিজ 'ব্রেকিং পয়েন্টস'-এ উপস্থিত হয়ে তার আশঙ্কা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ যেভাবে এগোচ্ছে সে সম্পর্কে আমার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানের অনেক বেশি সুবিধা আছে। বাস্তবতা হলো, বর্তমানে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ, এবং ইরানিরা গত ২০ বছর ধরে এ সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে’।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরানিরা গত জুনে ১২ দিনের একটি যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরাইলি এবং আমেরিকান উভয়ের আক্রমণ ক্ষমতা পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। এছাড়া এই নতুন আক্রমণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি নিতে তারা আট মাস সময় পেয়েছে। জিয়াংয়ের মতে, ইরানের প্রক্সিগুলো—হুথি, হিজবুল্লাহ ও হামাস—আমেরিকান মানসিকতা বুঝতে পেরেছে এবং এখন তাদের কাছে আমেরিকান সাম্রাজ্যকে দুর্বল করার একটি কার্যকর কৌশল রয়েছে।
ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ পূর্বাভাস
সাম্প্রতিক এক লেকচারে জিয়াং বলেছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘকাল ধরে চলবে এবং যখন এটি অবশেষে শেষ হবে, পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না। তার এই বক্তব্য ইন্টারনেটে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
জিয়াং-এর বৃহত্তর ভবিষ্যদ্বাণীগুলো শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হবে কিনা তা সময়ই বলবে। তবে বর্তমানে, এই অধ্যাপকের একসময়ের অখ্যাত বক্তৃতাটি তাকে ইন্টারনেটের সবচেয়ে আলোচিত ভূ-রাজনৈতিক পূর্বাভাসদাতাদের একজনে পরিণত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অনেক অনলাইন ব্যবহারকারী অধ্যাপক জিয়াং-এর লেকচারটিকে অস্বাভাবিকভাবে সঠিক ভূ-রাজনৈতিক পূর্বাভাসের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
সূত্র: এনডিটিভি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
