ইরানের ওপর হামলা: সামরিক প্রতিশোধ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরানের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অধ্যাপক মান্নানের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের নানা দিক।
ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক চাপ
অধ্যাপক মান্নান বলেছেন, ইরান হয়তো কিছু প্রতিশোধমূলক হামলা চালাবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক শক্তি মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা তাদের নেই। ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, এবং গত জুন মাসে ইসরায়েলের সাথে সংঘাতের সময় তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারণে বিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী দুই সামরিক শক্তিধর দেশকে একা মোকাবিলা করা ইরানের পক্ষে সম্ভব হবে না, অন্তত দীর্ঘমেয়াদে নয়।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও শাসনব্যবস্থার ভঙ্গুরতা
ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ বলে উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক মান্নান। শাসকগোষ্ঠী জনগণের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা অভ্যন্তরীণ সমর্থন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো বড় শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকা এই শাসনব্যবস্থার সমর্থন অনেকটাই ভঙ্গুর, এবং যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থানের কাছে ইরান একসময় ভেঙে পড়তে পারে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা
ইরানের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক মান্নান। সাদ্দাম হোসেনের ইরাক বা গাদ্দাফির লিবিয়ার মতো ইরানও একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। যদিও ইরানের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, তবু এর পতন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। ইরানিরা ঐতিহ্যগতভাবেই প্রচণ্ড জাতীয়তাবাদী, এবং বিদেশি শক্তির খবরদারি তারা দীর্ঘ মেয়াদে মেনে নেবে না।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থান
পশ্চিমা দেশগুলো যেমন যুক্তরাজ্য এই হামলাকে সমর্থন করলেও, চীন ও রাশিয়া এটিকে অবৈধ বলে উল্লেখ করেছে। আন্তর্জাতিক আইনপরিপন্থী এই হামলার জন্য অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে আইনগতভাবে ইরানকে হামলা করার যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের হামলার নিন্দা করেছে, কারণ ইরান তাদের কাছে একটি হুমকি। তারা ভেতরে ভেতরে খুশি যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা নির্মূল হলে তাদের জন্য ভালো হবে, তবে এতে মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাবনা ও বৈশ্বিক প্রভাব
সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো স্বল্প মেয়াদে জয়লাভ করবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে তারা আফগানিস্তানের মতোই ব্যর্থ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কোনো বড় শক্তির জন্যই লাভজনক হয় না এবং একসময় তা জনসমর্থন হারায়। ইরান যদি অস্থিতিশীল হয়, তবে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে এবং সাপ্লাই চেইন হুমকির মুখে পড়বে। রাশিয়া বা চীন সরাসরি ইরানকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে না বলে মনে করেন অধ্যাপক মান্নান, কারণ চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করেনি।
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে সংশয়
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই বলে উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক মান্নান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারেনি, এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কয়েক বছর পিছিয়ে গিয়েছে। তারা পারমাণবিক শক্তি অন্য কাজে ব্যবহার করছে, কিন্তু অস্ত্র তৈরির কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই।
