মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান হামলা

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের সূচনা: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরান লক্ষ্য

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক আকাশে নূতন করিয়া যুদ্ধের মেঘ ঘনাইয়া উঠিয়াছে। বেশ কয়েক মাস ধরিয়া প্রস্তুতির পর অবশেষে গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের উপর ব্যাপক হামলা চালাইয়াছে। এই সামরিক অভিযানে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে বলিয়া আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমসমূহ জানাইতেছে।

হামলার বিস্তারিত ও ক্ষয়ক্ষতি

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলা ইরানের রাজধানী তেহরানসহ ইসফাহান, কোম, কারাজ ও কারমানশাহ শহরে সংঘটিত হইয়াছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হইল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন ও তাহার কার্যালয়ের নিকটবর্তী এলাকায় একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গিয়াছে। তবে সৌভাগ্যবশত, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নিরাপদ স্থানে সরাইয়া লওয়া হইয়াছে বলিয়া কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করিয়াছে।

ইরানের বিরুদ্ধে এই নতুন সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হইয়াছে 'লায়ন'স রোয়ার'। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, এই যুদ্ধ কেবল ইরানের সামরিক সক্ষমতা পরীক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় নাই, বরং ইহা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার বৃহত্তর কৌশলের একটি অংশ।

যুদ্ধের উত্তাপ ছড়াইয়া পড়িয়াছে মধ্যপ্রাচ্যে

এইবার মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে এই যুদ্ধের উত্তাপ ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ইহার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করিয়াও হামলা চালাইয়াছে। এই দিকে ইরান ইসরাইলকে লক্ষ্য করিয়া পালটা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়িয়াছে, যাহাতে ইসরাইলের বিভিন্ন অঞ্চলে আতঙ্কের সৃষ্টি হইয়াছে।

ইসরাইলের পর এইবার বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গিয়াছে। উল্লেখ্য, এই সকল দেশের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রহিয়াছে, যাহা এই সংঘাতের আন্তর্জাতিক মাত্রা বাড়াইয়া দিয়াছে।

পারমাণবিক আলোচনা ও যুদ্ধের পটভূমি

ইহার পূর্বে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি লইয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়। মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি মন্তব্য করেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হইয়াছে। তাই আমরা আজকের দিন আলোচনা শেষ করিয়াছি।' আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় আবার তাহাদের বসিবার কথা ছিল; কিন্তু এই আলোচনার মধ্যেই অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হইয়া গেল।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সহিত পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন করিতে চাহিয়াছিল; কিন্তু ইরান তাহাতে সম্মত হয় নাই। বরং ইরান রাশিয়া ও চীনের সহিত অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি করে। যদিও ইরান দাবি করিয়া আসিতেছে যে, তাহাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ; কিন্তু তাহা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিকট বিশ্বাসযোগ্য বলিয়া বিবেচিত হয় নাই। এখন উভয় দেশ যুদ্ধে লিপ্ত হইয়া পড়িয়াছে।

যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

এই পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান জয়লাভ করিবে, ইহা কোনো উন্মাদও বিশ্বাস করেন না। কেননা বিশ্বের শক্তিশালী দেশটির সামরিক শক্তির তুলনায় ইরান ধারেকাছেও নাই। অন্যদিকে গ্লোবাল ভিলেজের এই যুগে যে কোনো যুদ্ধের কোনো না কোনো নেতিবাচক প্রভাব সমগ্র বিশ্বেই পড়িতে দেখা যায়।

  • মধ্যপ্রাচ্য অশান্ত হইয়া উঠিলে জ্বালানিসহ আন্তর্জাতিক ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্বের সর্বত্র আছড়াইয়া পড়িতে বাধ্য।
  • মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে টেরোরিজম বা সন্ত্রাসবাদ আবার নূতন করিয়া বাড়িয়া গেলে তাহাতে অবাক হইবার কিছু থাকিবে না।
  • অতীতে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া প্রভৃতি দেশে যুদ্ধের ফল কীরূপ হইয়াছে তাহা কাহারো অজানা নহে।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে আমরা যুদ্ধে বিবদমান উভয় পক্ষকে বলিব, যুদ্ধ বন্ধ করিয়া আবার আলাপ-আলোচনায় ফিরিয়া যাওয়াই হইবে বুদ্ধিমানের কাজ। কূটনৈতিক আলোচনা ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নহে। কেননা যুদ্ধের পরিণতি কখনোই শুভ হয় না। ইহাতে যুদ্ধাক্রান্ত দেশ ভাবিতে পারে, দেশে লক্ষ লক্ষ সৈন্য রাখিয়া লাভ কী? তাহারা ভাবিতে পারেন, অস্ত্রশস্ত্রে পারা যাইবে না। সেই সংগতি তাহাদের নাই। তাই তাহারা আবার চরমপন্থা বাছিয়া লইতে পারেন। একবার ভাবিয়া দেখা প্রয়োজন, পৃথিবীর অন্য দেশসমূহ একই পন্থা অবলম্বন করিলে এই পৃথিবী কি আর বসবাসযোগ্য থাকিবে?