বাংলাদেশে বর্ষায় গড়ে ২ হাজার ২০ থেকে ২ হাজার ৩২৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিবহুল দেশগুলোর একটি। এই বৃষ্টির মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ধরে রাখতে পারলেই দেশের বার্ষিক পানির চাহিদার বড় অংশ মেটানো সম্ভব। কিন্তু বর্ষা শেষ হতে না হতেই পানি সংকট দেখা দেয়। পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ সুবাইল বিন আলমের মতে, "এত পানি পেয়েও আমরা পানি ধরে রাখতে পারছি না। এটা প্রকৃতির ব্যর্থতা নয়, এটা পরিকল্পনার ব্যর্থতা।"
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও পানির স্তর হ্রাস
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু ও পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঢাকার জলাবদ্ধতা ও যানজটে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।
ঢাকায় প্রতিদিন ভূগর্ভ থেকে তোলা হচ্ছে প্রায় ২৩ লাখ ঘনমিটার পানি, কিন্তু ফেরত যাচ্ছে নগণ্য পরিমাণ। ২০২৪ সালে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমেছে ৮৬ মিটারে, যেখানে ১৯৯৬ সালে ছিল ২৫ মিটার। প্রতিবছর এই স্তর ২ থেকে ৩ মিটার হারে কমছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকার উপরিভাগের জলাধার শুষ্ক মৌসুমে সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যেতে পারে।
গাছের ভূমিকা ও ভুল প্রজাতি নির্বাচন
দেশীয় প্রজাতির গাছ যেমন হিজল, বরুণ, কদম, তাল, করচ, বটের গভীর মূলতন্ত্র মাটিতে পানির পথ তৈরি করে এবং ভূগর্ভস্থ পানি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। অথচ রাস্তার পাশে লাগানো হচ্ছে ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণি। গবেষণা বলছে, একটি ইউক্যালিপটাস গাছ বয়স অনুযায়ী দৈনিক ৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত ভূগর্ভের পানি শুষে নেয়, যা মাটি শুকিয়ে দেয় এবং পানি ফেরত দেয় না।
ভারতের রাজস্থানে বছরে মাত্র ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, কিন্তু দেশীয় গাছ ও ঐতিহ্যবাহী পানি সংরক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৬ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত ওপরে তোলা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশে বৃষ্টি হয় তার সাত গুণ বেশি।
পানি সংরক্ষণের কার্যকর পদ্ধতি
একটি এক হাজার বর্গফুটের ছাদ থেকে বছরে প্রায় এক লাখ লিটার বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা সম্ভব। গৃহস্থালির ব্যবহৃত পানি, রান্নাঘর ও বাথরুমের হালকা দূষিত পানি সামান্য পরিশোধন করে বাগানে সেচ, শৌচাগার বা মেঝে ধোয়ায় পুনরায় ব্যবহার করা যায়। সিঙ্গাপুর এই পদ্ধতিতে দেশের ৪০ শতাংশ পানির চাহিদা মেটাচ্ছে।
মাটিতে ৩ থেকে ৫ ফুট গর্ত করে বালু ও নুড়ি ভরে দিলে বৃষ্টির পানি সরাসরি ভূগর্ভে যায়। জাপানের টোকিওতে প্রতিটি নতুন ভবনে বাধ্যতামূলক বৃষ্টির পানি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা রাখা হয়। চীন উহান, সাংহাই, হারবিনসহ একাধিক শহরে ‘স্পঞ্জ শহর’ মডেল তৈরি করছে, যেখানে শহর বৃষ্টির পানি শোষণ, ধরে রাখা এবং পুনরায় ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে।
উপকূলীয় অঞ্চলে পানির সংকট
উপকূলীয় এলাকার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নলকূপের পানি লবণাক্ত হয়ে গেছে। গত চার দশকে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং লবণাক্ততার বিস্তার এখন ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত। প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ এই ঝুঁকিতে আছে। ইউএনডিপির ২০২৪ সালের জরিপে দেখা গেছে, উপকূলীয় পাঁচটি জেলার ৭৩ শতাংশ পরিবার অনিরাপদ লবণাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রসহ একাধিক গবেষণা বলছে, লবণাক্ত পানি পানে উপকূলীয় নারীদের মধ্যে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও অকালপ্রসবের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষ বিশুদ্ধ পানির জন্য দিনে ২ থেকে ৩ কিলোমিটার হাঁটে। একটি পরিবারের জন্য ১০ হাজার লিটারের একটি ট্যাংক পুরো শুষ্ক মৌসুম পার করে দিতে পারে। সাতক্ষীরার শ্রীফলতলায় একটি সমবায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ৫০টি পরিবার শুকনো মৌসুমেও পানির জোগান পাচ্ছে।
মাটির স্বাস্থ্য ও পানি ধারণক্ষমতা
বাংলাদেশের কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের আদর্শ মাত্রা ৩ থেকে ৫ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবতা হলো ১ শতাংশ বা তারও কম। কোনো কোনো এলাকায় তা শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত নেমে গেছে। দুর্বল মাটি পানি ধরে রাখতে পারে না, বন্যায় ভেসে যায়, খরায় ফেটে যায়।
গবেষণা বলছে, মাটিতে প্রতি ১ শতাংশ জৈব পদার্থ বাড়ালে প্রতি হেক্টরে দেড় লাখ লিটার বাড়তি পানি ধরে রাখার সক্ষমতা তৈরি হয়। বৃষ্টির পানি ও কম্পোস্টের সমন্বয় ফসলের ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার ৭০ শতাংশই জৈব এবং কম্পোস্টযোগ্য। প্রতিটি পরিবার রান্নাঘরের বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি শুরু করলে মাটির স্বাস্থ্য ও ভাগাড়ের চাপ দুটোই কমবে।
জলাবদ্ধতা: ড্রেন বড় করলেই সমাধান নয়
ঢাকায় এক ঘণ্টা ভারী বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি। রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, একসময় ঢাকায় ৭৫টি খাল ছিল, যার বেশির ভাগ দখল বা ভরাট হয়ে গেছে। অবশিষ্ট আছে মাত্র ২৬টি। গত ৩০ বছরে ঢাকার ৬০ শতাংশ জলাভূমি এবং ৬৫ শতাংশ খাল হারিয়ে গেছে। ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঘণ্টায় মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি সামলাতে পারে, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ছে।
নেদারল্যান্ডস নদী ও খালের চারপাশের জমি ছেড়ে দিয়ে বন্যা ধরে রাখার জলাধার তৈরি করেছে। ঢাকার বেগুনবাড়ি খাল বা কল্যাণপুর এলাকাকে এভাবে পানি ধরে রাখার পার্কে রূপান্তর করা সম্ভব। টোকিওতে শহরের নিচে একটি বিশাল পানি ব্যবস্থাপনা সুড়ঙ্গ শহরকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে ১ টাকা বিনিয়োগে ৪ থেকে ৭ টাকা সাশ্রয় হয় পানি কেনা ও স্বাস্থ্য খরচ থেকে। রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকলেও ২০২৩ পর্যন্ত ঢাকার ৯২ শতাংশ নতুন ভবনে তা নেই, কারণ জরিমানা মাত্র ৫০ হাজার টাকা। জার্মানিতে বৃষ্টির পানি না ধরে রাখলে বাড়তি কর দিতে হয়। সেই মডেলে গেলে ভবনমালিক নিজেই ব্যবস্থা নেবেন।
প্রতিবছর বৃষ্টি আসে এবং চলে যায়। প্রশ্ন একটাই, এবার কি আমরা শুধু ভিজব, নাকি পানিটা ধরে রাখব? প্রকৃতি প্রতিবছর সুযোগ দিচ্ছে। সিদ্ধান্ত আমাদের।



