এখন জুন মাস চলছে। আকাশের দিকে তাকালে মেঘ দেখা যায়, কিন্তু বৃষ্টি তেমন নেই। গরম কমছে না। রাতে ফ্যান চালিয়েও ঘুম আসে না। মনে হচ্ছে, বর্ষা এবার আসতে ভুলে গেছে। কিন্তু তা নয়, বর্ষা এক জায়গায় আটকে গেছে। এর কারণ হলো প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট এল নিনো।
এল নিনো কী ও কীভাবে বর্ষাকে প্রভাবিত করে?
এল নিনো একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার অর্থ ‘ছোট ছেলে’। পেরুর জেলেরা বহু আগে লক্ষ করেছিলেন, ডিসেম্বরে সমুদ্রের পানি হঠাৎ গরম হয়ে গেলে মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যায়। সেই উষ্ণ জলস্রোতের নামই এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে পানি গরম হলে সেখানকার বাতাস ওপরে উঠে যায়, মেঘ জমে ও সেখানেই বৃষ্টি হয়। কিন্তু একই সময়ে ভারত মহাসাগরের দিকে যে মৌসুমি বায়ু আসার কথা, তা আসতে পারে না। এই বায়ু প্রতিবছর বাংলাদেশে বর্ষা টেনে আনে। মৌসুমি বায়ু দুর্বল হলে বর্ষা পিছিয়ে যায় ও বৃষ্টি কমে যায়।
মৌসুমি বায়ু সাধারণত জুনের শুরুতে ভারতের কেরল হয়ে উত্তরে উঠে আসে, তারপর বাংলাদেশে ঢোকে। আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে পুরো যাত্রা। এল নিনোর বছরে এই পথ বাধাগ্রস্ত হয়। বায়ু দুর্বল হয়ে মাঝপথে থেমে যায়, কোনো কোনো বছর সপ্তাহ দুয়েক দেরি হয়। এই দুই সপ্তাহের দেরিতে কৃষকের অনেক হিসাব উল্টে যায়।
২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা ও ২০২৬ সালের পূর্বাভাস
২০২৪ সালে ঠিক এটা হয়েছিল। সেবার আবহাওয়া অধিদপ্তর টানা ৩৬ দিন তাপপ্রবাহ রেকর্ড করেছিল। তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। এপ্রিল থেকে মে পুরোটাই রোদে পুড়ল। বর্ষা এসেছিল ঠিকই, তবে অনেক পরে।
এই বছর, মানে ২০২৬ সালে সেই আশঙ্কা আবার দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলো বলছে, বছরের মাঝামাঝি থেকে এল নিনো সক্রিয় হতে পারে। এবারেরটা বেশ শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘সুপার এল নিনো’। ঘটনাটি বিরল। প্রভাব পড়বে অনেক বেশি জায়গায়, অনেক বেশি সময় ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া সংস্থা নোয়া বলছে, এই মুহূর্তে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। সামনের মাসগুলোয় সেটা আরও বাড়তে পারে। এর মানে, বর্ষার পুরোটা সময় ধরেই প্রভাব থাকতে পারে। শুধু শুরুতে নয়।
বর্ষা না এলে কৃষি ও অর্থনীতিতে প্রভাব
বর্ষা না এলে শহরে থাকলে চট করে টের পাওয়া যায় না। কিন্তু গ্রামে গেলে দেখা যাবে, কৃষকেরা জুনে বৃষ্টির জন্য বসে আছেন। বৃষ্টি না নামলে মাটি ফেটে যায়। বীজ বোনার সময় পার হয়ে যায়। ধানের চারা রোপণ পিছিয়ে যায়। আর সেটা পিছিয়ে গেলে পুরো ফসলের মৌসুমটাই এলোমেলো হয়। আমন ধান সময়মতো না লাগালে শীতের আগে পাকে না। তখন কৃষকের হাতে ফসল আসে দেরিতে, বাজারে চালের দাম বাড়ে। এই চাপ শেষমেশ শহরেও এসে পড়ে।
এল নিনো ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব
তবে একটা কথা, এল নিনো সব সময় বৃষ্টি কমায় না। কোনো কোনো অঞ্চলে বন্যাও আনে। কতটা শক্তিশালী, কখন সক্রিয় হলো, আর সেই সময়ে বায়ুমণ্ডলে আর কী ঘটছে, সব মিলিয়ে ফলটা বদলায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইতিহাস যা বলছে, সেটা হলো এল নিনোর বছরে বৃষ্টি কম হয়, গরম বেশি পড়ে। বর্ষা সময়মতো আসে না।
এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন যোগ হয়েছে। পৃথিবী এমনিতেই গরম হচ্ছে, তার ওপর এল নিনো এলে দুটি মিলে তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়। ১৯৯৭–৯৮ সালের এল নিনো ছিল সেই সময় পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু ২০২৩–২৪ সালেরটা তার কাছাকাছি শক্তিতে এসেও বেশি ক্ষতি করেছে। কারণ, পৃথিবী আগের চেয়ে বেশি গরম হয়ে পড়েছে। একই ঘটনা একটা উত্তপ্ত পৃথিবীতে ঘটলে পরিণতি বদলে যায়।
পূর্বাভাসের সুবিধা ও সম্ভাব্য সমাধান
একটু ভালো খবরও আছে। এল নিনো এখন আর হঠাৎ আসে না। অনেক আগে বোঝা যায়। কয়েক মাস আগেই পূর্বাভাস মেলে। সেই সময় কাজে লাগালে কৃষকেরা আগাম জানতে পারেন। ধানের জাত বদলাতে পারেন। কম পানিতে চাষ হয়, এমন ধান বেছে নিতে পারেন। স্থানীয় পর্যায়ে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা যায়।
বর্ষা প্রতিবছর একইভাবে আসবে, এটা এখন ধরে নেওয়া যায় না। আকাশে মেঘ দেখলেই বৃষ্টির নিশ্চয়তা নেই। এর জন্য দায়ী এল নিনো।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া)



