ধরিত্রী দিবস: বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও যুদ্ধের কার্বন ক্ষত
বাংলাদেশের জন্য ধরিত্রী দিবস পালন কোনো প্রতীকী অনুষ্ঠান নয়, এটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। প্রতিবছর ২২ এপ্রিল যখন ধরিত্রী দিবস পালিত হয়, তখন এটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং প্রতিটি মানুষের বিবেকের কাছে এক কঠিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—আমরা কি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে পারছি?
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ও গভীর আহ্বান
২০২৬ সালের ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আওয়ার পাওয়ার, আওয়ার প্ল্যানেট’ বা ‘আমাদের শক্তি, আমাদের ধরিত্রী’। এই বার্তাটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর গভীরে নিহিত রয়েছে এক বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আহ্বান। ধরিত্রী রক্ষার এই দীর্ঘমেয়াদি লড়াই কোনো একক সরকার বা বার্ষিক সম্মেলনের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি নির্ভর করে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস, নাগরিক সচেতনতা এবং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ওপর।
যুদ্ধের কার্বন-ক্ষত: অদৃশ্য ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনকে আমরা যখন ‘মানবসৃষ্ট’ দুর্যোগ বলি, তখন সেই তালিকায় ‘যুদ্ধ’ শব্দটিকে প্রায়ই আড়ালে রাখি। অথচ আধুনিক যুদ্ধ হলো একটি অতিকায় কার্বন নির্গমনকারী যন্ত্র। সামরিক খাতের কার্বন নিঃসরণ নিয়ে তথ্যগত ঘাটতি বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি বড় সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী সামরিক খাতের মোট ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ বৈশ্বিক নির্গমনের প্রায় ৫.৫ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ নিঃসরণের তথ্য অধিকাংশ দেশই পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করে না।
ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে যুদ্ধের একাধিক উৎস থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধজনিত মোট নিঃসরণ ৩১১ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়িয়েছে, যা একটি উন্নত দেশের বার্ষিক নিঃসরণের সমান। অন্যদিকে, গাজা সংকটের কার্বন ফুটপ্রিন্ট প্রায় ৩৩ মিলিয়ন টন, যা জর্ডানের মতো একটি দেশের বার্ষিক নিঃসরণের সমান।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: জলবায়ু ঝুঁকি ও অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের জন্য ধরিত্রী দিবস পালন কোনো প্রতীকী অনুষ্ঠান নয়, এটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। বিশ্ব জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে আমরা দীর্ঘকাল ধরে প্রথম সারিতে আছি। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আমাদের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। উপকূলে লবণাক্ততা বাড়ায় লাখ লাখ মানুষের জীবিকা আজ বিপন্ন।
তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ জলবায়ু প্রতিশ্রুতিতে পিছিয়ে নেই। ২০২৫ সালে জমা দেওয়া ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’ (এনডিসি) অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে আমাদের নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ২০.৩১ শতাংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অর্থায়ন আসবে কোত্থেকে? জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) বাস্তবায়নে আগামী কয়েক দশকে আমাদের প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এই অর্থের বড় অংশই আন্তর্জাতিক উৎসের ওপর নির্ভরশীল।
টেকসই অর্থায়ন ও ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম বড় অস্ত্র হলো ‘টেকসই অর্থায়ন’ (সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স)। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২০ সালের টেকসই অর্থায়ন নীতিমালা এ ক্ষেত্রে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। এর লক্ষ্য হলো এমন সব প্রকল্পে মূলধন সরবরাহ করা, যা কার্বন নিঃসরণ কমাবে এবং পরিবেশগত সহনশীলতা বাড়াবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু অর্থায়নের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঋণের উচ্চ সুদ। আইএমএফের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর চেয়ে গড়ে ১ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি সুদ দিতে বাধ্য হয়। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জোট ‘ভি-২০’-এর হিসাব মতে, গত এক দশকে এই ‘ক্লাইমেট প্রিমিয়াম’-এর কারণে তারা ৬২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত সুদ দিয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক নির্দেশনাগুলো অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ২০২৫ সাল থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মোট মেয়াদী ঋণের ৫ শতাংশ সরাসরি ‘সবুজ অর্থায়ন’ এবং ৪০ শতাংশ ‘টেকসই অর্থায়নে’ ব্যয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে টেকসই অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে।
গ্রিন বন্ড ও বৈশ্বিক পুঁজির বৈষম্য
কেবল ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ সবুজ রূপান্তর সম্ভব নয়। পরিবেশবান্ধব প্রকল্পগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাই পুঁজিবাজার ও ‘গ্রিন বন্ড’-এর ভূমিকা এখানে অপরিহার্য। গ্রিন বন্ডের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বচ্ছতা—বিনিয়োগকারী নিশ্চিত থাকতে পারেন যে তাঁর অর্থ পরিবেশবান্ধব প্রকল্পেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
পৃথিবীতে আজ অর্থের অভাব নেই, কিন্তু অর্থের গন্তব্যে সমস্যা আছে। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও ২০৫০ সালের মধ্যে ‘নেট-জিরো’ নিঃসরণ অর্জনে ভৌত অবকাঠামোতে বছরে গড়ে ৯.২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করা প্রয়োজন। এই ব্যবধান কমানোর জন্য উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি পালন জরুরি।
দ্বিমুখী কৌশল ও ভবিষ্যৎ পথ
বাংলাদেশের জন্য এখন দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বনের সময়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের জোরালো দাবি তুলতে হবে, যাতে যুদ্ধের কারণে জলবায়ু লক্ষ্যের যে বিচ্যুতি ঘটছে, তার দায়ভার উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর না পড়ে। অন্যদিকে, দেশের ভেতরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি ঋণ প্রস্তাবনা মূল্যায়নের সময় ‘পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি’ (ইএসআরএম) বিবেচনা করা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
পরিশেষে, ধরিত্রী দিবসকে কেবল পোস্টার বা স্লোগানে আটকে রাখলে চলবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে দেশে উপকূল ভাঙে, যেখানে শহরের বায়ু বিষাক্ত হয়—সে দেশে ধরিত্রী দিবস মানে জীবন-মরণের প্রশ্ন। আমাদের শক্তি লুকিয়ে আছে সঠিক সিদ্ধান্তে, সামাজিক জাগরণে, আধুনিক নীতিতে এবং সবুজ বিনিয়োগের অঙ্গীকারে। আসুন, এবারের ধরিত্রী দিবসে আমরা শপথ নিই, আমরা এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলব যা কেবল মুনাফা নয়, মানুষ এবং এই গ্রহকেও সুরক্ষা দেবে।



