আমিরাতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধের জোরালো আহ্বান
সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ শিক্ষাবিদ ও নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি আব্দুল খালেক আব্দুল্লাহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রোববার দেওয়া একটি পোস্টে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এখন সময় এসেছে আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে এই ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার বিষয়ে গভীরভাবে বিবেচনা করার।
'আমাদের আর ওয়াশিংটনের প্রয়োজন নেই'
আব্দুল খালেক তার বক্তব্যে দৃঢ়ভাবে জানান, নিজেদের নিরাপত্তা ও রক্ষার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের আর যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। তিনি ইরানের আগ্রাসনের সময় আমিরাতের স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, দেশটি ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে তারা নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম।
তিনি আরও যোগ করেন, 'এগুলো (মার্কিন ঘাঁটিগুলো) এখন আর কোনো কৌশলগত সম্পদ নয়, বরং একটি বোঝায় পরিণত হয়েছে।' তার মতে, আমিরাতের বর্তমান প্রয়োজন হলো যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মানের ও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করা, স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পরিসংখ্যান
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কমপক্ষে ১৯টি সামরিক ঘাঁটি সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে আটটিকে স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর আগে এই অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল, যার মধ্যে শুধুমাত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতেই ৩ হাজার ৫০০ সেনা অবস্থান করছেন।
এছাড়াও, আমিরাতে আল-দাফরা বিমানঘাঁটি রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের যৌথ ব্যবহারের অধীনে পরিচালিত হয়। এই বিমানঘাঁটিটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
যুদ্ধের প্রভাবে আমিরাতের ভয়াবহ পরিস্থিতি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত অত্যন্ত ভয়াবহ ও জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। ইরান শুধুমাত্র ইসরাইলকেই নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোকেও তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে, যার মধ্যে আমিরাত বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্চ মাস পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে আমিরাতের উপর মোট ৩৯৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১ হাজার ৮৭২টি ড্রোন এবং ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। যদিও আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ আক্রমণই সফলভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও ক্ষয়ক্ষতি সম্পূর্ণভাবে এড়ানো যায়নি।
অর্থনৈতিক ক্ষতির বিশাল মাত্রা
এই যুদ্ধের ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। দেশটির অর্থনীতি মূলত পর্যটন, রিয়েল এস্টেট, লজিস্টিকস ও আর্থিক খাতের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যা যুদ্ধের প্রভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, গত কয়েক সপ্তাহে দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজারে ১২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাজার মূলধন হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের হিসাবে ১৮ হাজার ৪০০টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, যা পরিবহন খাতে ব্যাপক ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে।
মার্চ মাসের শেষদিকে দুবাইয়ের রিয়েল এস্টেট সূচক যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় কমপক্ষে ১৬ শতাংশ নিচে নেমে গেছে। যদিও আমিরাতের উপর চালানো বেশিরভাগ আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে, তবুও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আবুধাবি ও দুবাইয়ের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- বুর্জ আল আরব হোটেল
- পাম জুমেইরাহ রিসোর্ট
- দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
- ফুজাইরাহ তেল শিল্পাঞ্চল
এই পরিস্থিতিতে আব্দুল খালেক আব্দুল্লাহর মার্কিন ঘাঁটি বন্ধের আহ্বান আমিরাতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশল ও বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।



