শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশটির পার্লামেন্ট মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সংসদ সদস্যদের পেনশন সুবিধা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ৪৯ বছরের পুরনো 'পার্লামেন্টারি পেনশন অ্যাক্ট' আইনটি রদ করা হলো। প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী সরকার রাজনীতিবিদদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা কমানোর সরকারি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
পেনশন বাতিলের পটভূমি
শ্রীলঙ্কার সরকার গত কয়েক মাস ধরে রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্টদের জন্য বরাদ্দকৃত বিলাসবহুল আবাসন, গাড়ি এবং হাজার হাজার দেহরক্ষী প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পেনশন বাতিলের এই সিদ্ধান্তটি সেই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ সংযোজন। আইনমন্ত্রী হর্ষনা নানায়াক্কারা পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেন, "বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংসদ সদস্যদের বিতর্কের মান এবং তাদের কর্মকাণ্ড দেখে সাধারণ মানুষ মনে করে না যে তারা পেনশন পাওয়ার যোগ্য।" তার এই বক্তব্য পার্লামেন্টে ব্যাপক সমর্থন পায়।
ভোটের ফলাফল ও বিরোধিতা
২২০ সদস্যের শ্রীলঙ্কান পার্লামেন্টে শাসক দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় প্রস্তাবটি সহজেই পাস হয়েছে। মোট ১৫৪ জন আইনপ্রণেতা পেনশন বাতিলের পক্ষে ভোট দেন, যখন মাত্র ২ জন এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেন। তবে বিরোধী দলীয় নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে সংসদ সদস্যদের অবসরের পর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেনশন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রেমাদাসা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, পেনশন না থাকলে অনেক সংসদ সদস্য দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনে প্রলুব্ধ হতে পারেন, যা অবসরকালীন জীবনের সচ্ছলতা নিশ্চিত করার জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ পথ হতে পারে।
পুরনো আইনের বৈষম্য
উল্লেখ্য, আগের আইন অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য মাত্র ৫ বছর দায়িত্ব পালন করলেই আজীবন পেনশনের অধিকারী হতেন। এই নিয়মটি সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য শর্তের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় ছিল। সাধারণ কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা পেতে কমপক্ষে ১০ বছর চাকরি করতে হতো। এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সাবেক নেতাদের বিলাসিতা বন্ধ
শ্রীলঙ্কা সরকার গত সেপ্টেম্বর মাস থেকেই সাবেক নেতাদের বিলাসিতা বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে সরকারি বাংলো ছাড়তে অস্বীকৃতি জানানোর পর থেকে সরকার জ্বালানি খরচ, সচিবালয় কর্মী এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মতো সুযোগ-সুবিধা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ২০২২ সালে ব্যাপক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া গোটাবায়া রাজাপাকসেও পদত্যাগের পর সরকারি বাংলো ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই সমস্ত পদক্ষেপ শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষের মাঝে রাজনীতিবিদদের প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
সরকারের উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
বর্তমান সরকারের এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা। পেনশন বাতিলের সিদ্ধান্তটি শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। এখন থেকে শ্রীলঙ্কার সংসদ সদস্যরা অবসরের পর আর কোনো রাষ্ট্রীয় ভাতা পাবেন না, যা তাদের জন্য আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে। তবে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো যে এই সিদ্ধান্ত রাজনীতিবিদদের আরও বেশি দায়িত্বশীল ও জনগণের প্রতি জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে।
শ্রীলঙ্কার এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে那些 দেশগুলিতে যেখানে রাজনীতিবিদদের জন্য অনুরূপ বিশেষ সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। দেশটির সাধারণ মানুষ এই পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যদিও বিরোধী দলীয় মহল থেকে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা এখন দেখার বিষয়, তবে নিঃসন্দেহে এটি শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে স্থান পাবে।
