নাভালনি হত্যায় 'ডার্ট ফ্রগ' বিষের অভিযোগ, রাশিয়া প্রত্যাখ্যান করেছে
নাভালনি হত্যায় 'ডার্ট ফ্রগ' বিষের অভিযোগ

নাভালনি হত্যায় 'ডার্ট ফ্রগ' বিষের অভিযোগ, রাশিয়া প্রত্যাখ্যান করেছে

ইউরোপের পাঁচটি দেশ যৌথভাবে অভিযোগ করেছে যে, রাশিয়ার প্রখ্যাত বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনিকে হত্যা করতে দক্ষিণ আমেরিকার বিষাক্ত 'ডার্ট ফ্রগ' বা তীরের ফলার মতো ব্যাঙের বিষ ব্যবহার করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডস শনিবার এক বিবৃতিতে এই দাবি তুলে ধরেছে। তবে মস্কো এই অভিযোগকে 'প্রোপাগান্ডা' বলে প্রত্যাখ্যান করেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

বিষের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও প্রভাব

বিবৃতিতে দেশগুলো জানিয়েছে, নাভালনির শরীরের নমুনায় 'এপিবেটিডিন' নামক নিউরোটক্সিনের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেছে। এটি মূলত দক্ষিণ আমেরিকার রেইনফরেস্টে পাওয়া এক ধরনের ছোট ও উজ্জ্বল রঙের বিষাক্ত ব্যাঙের শরীর থেকে নিঃসৃত হয়। প্রাকৃতিকভাবে রাশিয়ায় এই বিষ পাওয়া যায় না, যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে।

ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের ধারণা, নাভালনির ক্ষেত্রে এই বিষটি ল্যাবে তৈরি করা হয়েছিল। এটি স্নায়ু গ্যাসের মতো কাজ করে, যার ফলে শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, হৃদস্পন্দন কমে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটে। এই বিষের প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক এবং এটি ব্যবহারের পদ্ধতি অত্যন্ত পরিকল্পিত বলে মনে করা হচ্ছে।

নাভালনির মৃত্যু ও রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া

২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলের একটি কারাগারে ৪৭ বছর বয়সে নাভালনির মৃত্যু হয়। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, হাঁটার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং স্বাভাবিক কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর মতে, নাভালনির শরীরে পাওয়া বিষ এবং তার উপসর্গগুলো বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে হত্যার উচ্চ সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত দেয়।

রাশিয়া বরাবরের মতোই এই মৃত্যুতে তাদের কোনও দায় থাকার কথা অস্বীকার করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, রুশ সরকার এই অভিযোগকে 'পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা' হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছে। লন্ডনে রুশ দূতাবাস উপহাস করে বলেছে, 'একজন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা উচিত, কে এই ব্যাঙ নিয়ে আষাঢ়ে গল্প বিশ্বাস করবে?'

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ফল ও পদার্থের ফর্মুলা প্রকাশ না করা পর্যন্ত তারা কোনও মন্তব্য করবেন না। তিনি নাভালনিকে একজন 'ব্লগার' এবং রাশিয়ায় 'সন্ত্রাসী ও চরমপন্থি' হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেন, যা রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে।

নাভালনির রাজনৈতিক পটভূমি

নাভালনি ছিলেন রাশিয়ার প্রধান বিরোধী নেতা, যিনি ২০০৮ সাল থেকে ব্লগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাজপ্রম ও রোসনেফটের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আলোচনায় আসেন। ২০১১ সালে তিনি 'ফাউন্ডেশন ফর ফাইটিং করাপশন' প্রতিষ্ঠা করেন, যা দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এর আগেও ২০২০ সালে তিনি একবার বিষপ্রয়োগের শিকার হয়েছিলেন, যখন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জার্মানিতে নেওয়া হয়েছিল। সুস্থ হয়ে ২০২১ সালে দেশে ফিরলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা হয় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিন বছর তিনি কারাগারেই ছিলেন, যা তার রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

পরিবারের প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, 'প্রথম দিন থেকেই আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমার স্বামীকে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে, এখন তার প্রমাণ মিলেছে। সত্য উন্মোচনের জন্য আমি ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে কৃতজ্ঞ।' তার এই বক্তব্য নাভালনির পরিবারের দৃঢ় অবস্থানকে তুলে ধরে।

এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিযোগ এবং রাশিয়ার প্রত্যাখ্যান একটি জটিল কূটনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিষের উৎস এবং ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে চলমান তদন্ত বিশ্বব্যাপী নজর কেড়েছে, বিশেষ করে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সহিংসতার প্রসঙ্গে।