ইসরাইলের নতুন কৌশলে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল: পশ্চিম তীরে ভূমি নিবন্ধন পুনরায় শুরু
ইসরাইল সরকার ফিলিস্তিনিদের ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়ার জন্য একটি নতুন আইনি কৌশল গ্রহণ করেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ১৯৬৭ সালের পর প্রথমবারের মতো অধিকৃত পশ্চিম তীরে ভূমি নিবন্ধনের প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে তাদের পৈতৃক ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকারি অনুমোদন ও কট্টরপন্থি মন্ত্রীদের ভূমিকা
রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইসরাইলি সরকারের একটি বৈঠকে এই সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। দেশটির কট্টরপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ, বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজের উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই মন্ত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি অঞ্চলে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া
ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই আইনি প্রক্রিয়াকে ফিলিস্তিনিদের নিঃস্ব করার ছলচাতুরী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের মতে, ১৯৮৪ সাল থেকে স্থগিত থাকা এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জমির মালিকানা প্রমাণের সুযোগ সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের ভূমি দখলকে অনেক সহজ করে দেবে। ইসরাইলি আবাসন অধিকার সংস্থা 'বিমকোম'-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের প্রায় ৭০ শতাংশ ভূমির কোনো আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন নেই। ব্রিটিশ শাসনামল বা জর্ডান শাসনের সময় মাত্র ৩০ শতাংশ ভূমির নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছিল।
ফিলিস্তিনিদের জন্য অসম্ভব শর্ত
বর্তমান ইসরাইলি সরকার ফিলিস্তিনিদের কাছে এমন সব নথিপত্র দাবি করছে যা সংগ্রহ করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত হওয়ায় বা যুগের পর যুগ ধরে বংশপরম্পরায় ভূমি ব্যবহার করায় তাদের কাছে কোনো দাপ্তরিক কাগজ নেই। ফলে প্রমাণের অভাবে এই বিশাল পরিমাণ ভূখণ্ড ডিফল্টভাবে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের মালিকানাধীন হয়ে যাবে, যা ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের জন্য একটি ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে।
পূর্ব জেরুজালেমের অভিজ্ঞতা
এর আগে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে একই ধরনের ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে, নিবন্ধিত জমির মাত্র ১ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের নামে হয়েছে, আর বাকি ৯৯ শতাংশই ইসরাইলি রাষ্ট্র বা ব্যক্তিগত মালিকদের দখলে চলে গেছে। ইসরাইলি বসতিবিরোধী সংগঠন 'পিস নাউ' এই প্রক্রিয়াকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের 'পূর্ণ দখলদারিত্ব' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ২০২৪ সালে এক রুলে জানিয়েছিল, ইসরাইলের এই ধরনের ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ এবং জনসংখ্যা স্থানান্তর সম্পূর্ণ অবৈধ। তা সত্ত্বেও বেইজিং বা ওয়াশিংটনের চাপের তোয়াক্কা না করে ইসরাইল তাদের বসতি সম্প্রসারণের লক্ষ্য পূরণে আইনি পথেই এগোচ্ছে। ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট এই নিবন্ধন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর করা একটি আবেদন গত মাসে খারিজ করে দিয়েছে, যা এই প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অত্যন্ত ছোট একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ করে ফেলা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতকে আরও উসকে দেবে। এই পদক্ষেপ শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি জনগণের ভূমি অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। সূত্র: আল জাজিরা।
